জেফরি এপস্টাইন ফাইলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম আসা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আল সেকেলের ইমেইল ও ইসাবেল ম্যাক্সওয়েলের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই যোগসূত্রের বিস্তারিত জানুন।
বিতর্কিত মার্কিন ধনকুবের এবং যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের (Jeffrey Epstein) মামলা সংক্রান্ত নথিগুলো আদালত থেকে অবমুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন চলছে। সম্প্রতি এই নথিপত্রে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম পাওয়া গেছে বলে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে এক্স (টুইটার) এবং ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে তাকে এপস্টাইনের ‘বন্ধু’ বা ‘ক্লায়েন্ট’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
এই দাবির পেছনে ঐতিহাসিক নথি, ইমেইল আদান-প্রদান এবং গ্রামীণ আমেরিকার পেশাদার যোগাযোগ কতটুকু জড়িত, তা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
আল সেকেলের ইমেইল এবং ‘দ্য সিম্পসনস’ সংযোগ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম এপস্টাইন-সংক্রান্ত নথিতে আসার মূল সূত্র হলো একটি ইমেইল।
২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আল সেকেল (Al Seckel) নামক এক ব্যক্তি এই ইমেইলটি পাঠিয়েছিলেন।
আল সেকেল ছিলেন এপস্টাইনের দীর্ঘদিনের সহযোগী এবং গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের (Ghislaine Maxwell) বোন ইসাবেল ম্যাক্সওয়েলের স্বামী।
ইমেইলে আল সেকেল দাবি করেন যে, তিনি এবং তার স্ত্রী ইসাবেল মিলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিখ্যাত কার্টুন সিরিজ “দ্য সিম্পসনস”-এর স্রষ্টা ম্যাট গ্রোনিংয়ের (Matt Groening) সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
সেকেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই ড. ইউনূসকে সিম্পসনস-এর একটি বিশেষ পর্বে অতিথি চরিত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তথ্যসূত্র: ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর প্রকাশিত ‘Loan-a Lisa’ (সিজন ২২, এপিসোড ২) পর্বে ড. ইউনূসের একটি অ্যানিমেটেড ক্যামিও দেখা যায়, যেখানে তিনি মাইক্রোফাইন্যান্স নিয়ে কথা বলেন।
ইমেইলে ইউনূসকে ‘আমাদের অত্যন্ত ভালো বন্ধু’ (our very good friend) হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।
ইসাবেল ম্যাক্সওয়েল ও গ্রামীণ আমেরিকা সংযোগ
এপস্টাইন নেটওয়ার্কের সাথে ড. ইউনূসের পরোক্ষ যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন ছিলেন ইসাবেল ম্যাক্সওয়েল। ই
সাবেল পেশাদার জীবনে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ (Grameen America)-র সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল (এপস্টাইনের প্রধান সহযোগী) সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী হলেও তার বোন ইসাবেল ম্যাক্সওয়েল একজন পরিচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কাজ করেছেন।
ইসাবেলের মাধ্যমে ড. ইউনূসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সাথে এপস্টাইন সিন্ডিকেটের সদস্যদের পেশাদার বা সামাজিক যোগাযোগ থাকা অস্বাভাবিক ছিল না।
তবে এই যোগাযোগটি মূলত সামাজিক এবং পেশাদার স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে নথিপত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ আছে কি?
২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রকাশিত আদালতের কয়েক হাজার পৃষ্ঠার নথি (Giuffre vs. Maxwell Case) এবং মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) ফাইলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে এপস্টাইনের কুখ্যাত কোনো কাজে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ বা দাবি পাওয়া যায়নি।
নথিতে তার নাম আসার প্রধান কারণগুলো হলো:
১. পেশাদার যোগাযোগ: ইসাবেল ম্যাক্সওয়েলের গ্রামীণ আমেরিকায় কাজ করা।
২. ক্লিনটন ফাউন্ডেশন: এপস্টাইন ফাইলের অনেক জায়গায় ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের ইভেন্ট এবং গ্রামীণ আমেরিকার পিচ ডেক-এর উল্লেখ আছে,
যেখানে স্বাভাবিকভাবেই ড. ইউনূসের নাম এসেছে।
৩. ব্ল্যাক বুক: এপস্টাইনের যোগাযোগ তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ড. ইউনূসের কোনো প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা বা তার কুখ্যাত দ্বীপে ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
সৌদি বোর্ড মেম্বার ও গ্রামীণ-জামিল বিতর্ক
সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে তা হলো ‘গ্রামীণ-জামিল’ (Grameen Jameel)-এর বোর্ড মেম্বার মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ জামিলের নাম।
অভিযোগ রয়েছে যে, আব্দুল লতিফ জামিলের নাম এপস্টাইনের ‘ব্ল্যাক বুক’-এ বা যোগাযোগের তালিকায় ছিল।
যেহেতু আব্দুল লতিফ জামিল ড. ইউনূসের সাথে মাইক্রোফাইন্যান্স প্রজেক্টে যুক্ত ছিলেন,
তাই নেটিজেনদের একটি অংশ একে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে এপস্টাইন সিন্ডিকেটের সাথে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
বৈশ্বিক নিউজ পোর্টালের প্রেক্ষাপট
বিশ্বের প্রধান নিউজ পোর্টালগুলো যেমন বিবিসি (BBC), নিউ ইয়র্ক টাইমস (NYT) বা দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian) যখন এপস্টাইন ফাইলগুলো নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে,
সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এসেছে যারা এপস্টাইনের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন (যেমন প্রিন্স অ্যান্ড্রু, বিল ক্লিনটন বা ডোনাল্ড ট্রাম্প)।
তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম সেখানে মূল ‘অভিযুক্ত’ বা ‘ক্লায়েন্ট’ তালিকায় স্থান পায়নি।
তার নাম মূলত এসেছে তৃতীয় পক্ষের ইমেইল বা পেশাদার গ্রাফিক্সের সূত্রে।
রেফারেন্স লিঙ্কসমূহ:
- দ্য গার্ডিয়ান: এপস্টাইন ফাইল রিলিজ ও গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল মামলা
- বিবিসি নিউজ: এপস্টাইনের তালিকায় কারা আছেন?
উপসংহার
সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম এপস্টাইনের নথিতে সরাসরি কোনো যৌন অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আসেনি।
বরং আল সেকেল এবং ইসাবেল ম্যাক্সওয়েলের মাধ্যমে একটি পরোক্ষ সামাজিক ও পেশাদার যোগাযোগ সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইসাবেল ম্যাক্সওয়েল গ্রামীণ আমেরিকায় কাজ করার কারণে এবং ড. ইউনূসের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা থাকার কারণে বিভিন্ন হাই-প্রোফাইল মিটিং বা ইমেইলে তার নাম উল্লেখিত হওয়া স্বাভাবিক একটি বিষয়।
এখন পর্যন্ত ড. ইউনূস বা তার সচিবালয় থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে এই তথ্যগুলো অনলাইনে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।
