দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার থাকলেও দেড় বছরে প্রকাশ হয়নি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ। কেন এই নীরবতা, কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
বিস্তারিত রিপোর্ট
ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের অবস্থান হবে আপসহীন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে।
কিন্তু প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে থাকলেও এখনো পর্যন্ত কোনো উপদেষ্টার সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।
স্বচ্ছতার প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে একের পর এক দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। সেই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।
অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন, এই অরাজনৈতিক সরকারই বাংলাদেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি নতুন নজির স্থাপন করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সরকারের ভেতর থেকেই একাধিক উপদেষ্টা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোর আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নিষ্পত্তি হয়নি, তবুও সম্পদের হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টিআইবির উদ্বেগ
দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত দুঃখজনক” বলে মন্তব্য করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন,
“যারা জবাবদিহিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের অস্বচ্ছতা দেশবাসী মোটেও প্রত্যাশা করেনি।”
ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব?
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই ব্যর্থতা ভবিষ্যতের জন্য একটি খারাপ নজির হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন,
“একটি অরাজনৈতিক সরকার যদি প্রতিশ্রুতি দিয়েও নিজেদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করে, তাহলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য এটি একটি অজুহাত তৈরি করে দেবে।”
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে আগামী দিনে মন্ত্রী ও শীর্ষ আমলাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের সংস্কৃতি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
কেন প্রকাশ করা হয়নি সম্পদের হিসাব?
সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ বলছেন,
আইনি কাঠামোর অভাব বা সময়ের সংকট এর কারণ হতে পারে। আবার সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিই মূল সমস্যা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও অন্তর্বর্তী সরকার উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে। এতে শুধু সরকারের
বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়েনি, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
