ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগসহ সব দলের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিতের সুপারিশ করেছে কমনওয়েলথ। ইইউ জানিয়েছে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে।
বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়ায় কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন নতুন সরকারের প্রতি একটি বিশেষ সুপারিশ পেশ করেছে। মিশনটি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার ভবিষ্যতে নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পর্যবেক্ষক দল এই নির্বাচনকে ২০০৮ সালের পর প্রথম ‘সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক’ নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেছে।
কমনওয়েলথের সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক মিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর পূর্ণতা পেতে সব দলের অংশগ্রহণ জরুরি। প্রতিনিধিদলটি তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করে, “নতুন সরকারের প্রতি আমাদের সবল সুপারিশ থাকবে—ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার যেন নিশ্চিত করা হয়।”
পর্যবেক্ষক মিশনটি নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের সমর্থনের প্রতিফলন দেশের ভিত্তি আরও মজবুত করবে। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার নিয়ে তারা কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মিশনটি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভ্রান্তিমূলক কার্যক্রম এবং অপপ্রচার উদ্বেগজনক ছিল।
ভবিষ্যতে অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তি মোকাবিলায় সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মূল্যায়ন: ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশের এই নির্বাচনকে অত্যন্ত উচ্চমূল্য দিয়েছে।
ইইউ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস শনিবার সকালে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তার মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।”
ইইউ মিশনের মতে, এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং ভোটগ্রহণের সময় মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়টি ছিল গ্রহণযোগ্য।
ইইউ-এর উদ্বেগ ও সংস্কারের তাগিদ
নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হলেও ইইউ মিশন কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে:
১. নারী প্রার্থীর স্বল্পতা: রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে ছিল না বলে তারা মনে করে।
২. বিচ্ছিন্ন সহিংসতা: নির্বাচনের দিন এবং এর আগে-পরে ঘটা বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে।
৩. অনলাইনে অপপ্রচার: কমনওয়েলথের মতো ইইউ-ও অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার নিয়ে সতর্ক করেছে।
ইভার্স ইজাবস আরও জানান, বর্তমান নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করে অংশীজনদের আস্থা বজায় রাখতে পেরেছে।
তবে ভবিষ্যতে আইনি নিশ্চয়তা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করতে নির্বাচনী সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে ইইউ।
ফলাফল নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার আহ্বান
উভয় পর্যবেক্ষক মিশনই জোর দিয়ে বলেছে যে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর কোনো অভিযোগ থাকে, তবে তা যেন অবশ্যই রাজপথে আন্দোলনের পরিবর্তে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার (Election Tribunal) মাধ্যমে সমাধান করা হয়।
উপসংহার
কমনওয়েলথ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ইতিবাচক মূল্যায়ন নতুন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বৈধতা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা বা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে সুপারিশ করা হয়েছে,
তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
