ঢাকা-১৭ আসনের সেনানিবাস কেন্দ্রে বিএনপি প্রধান তারেক রহমানকে টপকে জামায়াত প্রার্থীর জয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আদর্শিক পরিবর্তনের আশঙ্কায় গভীর উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতির এক অভূতপূর্ব ও চাঞ্চল্যকর সমীকরণ উঠে এসেছে ঢাকা সেনানিবাস এলাকা থেকে। ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের অন্তর্গত ঢাকা সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমানকে পিছনে ফেলে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে গেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। এই নির্বাচনী ফলাফল এবং ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের (Postal Ballot) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চরম ডানপন্থী আদর্শের অনুপ্রবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ভোটের পরিসংখ্যান: তারেক রহমানকে টপকালেন খালিদুজ্জামান
নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড অনুযায়ী, ঢাকা সেনানিবাসের ভেতর অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে জামায়াতের ভোটপ্রাপ্তি ছিল ঈর্ষণীয়। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন একটি কেন্দ্রে মোট ৮,৮৫৬ জন ভোটারের মধ্যে ৪,১২১টি ভোট পড়ে। সেখানে জামায়াত প্রার্থী ড. এস এম খালিদুজ্জামান পেয়েছেন ২,০০৩টি ভোট। অন্যদিকে, বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান পেয়েছেন ১,৯৪২ ভোট।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ফলাফল এসেছে শহিদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্র থেকে। এখানে বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় জামায়াত প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়েছে। তারেক রহমান যেখানে মাত্র ৬৮১টি ভোট পেয়েছেন, সেখানে ড. খালিদুজ্জামান পেয়েছেন ১,২৬১টি ভোট। সেনানিবাস এলাকার মতো সুরক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ এলাকায় এই ফলাফল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।
ডাকযোগ ব্যালটে জামায়াতের আধিপত্য
প্রতিরক্ষা সূত্রের খবর অনুযায়ী, শুধু সরাসরি কেন্দ্রেই নয়, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটেও (Postal Ballot) জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ব্যাপক সমর্থন লক্ষ্য করা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে অবস্থানরত সাধারণ সৈনিকদের (অফিসার পদমর্যাদার নিচে) প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটে জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করেছেন। সাধারণত সেনানিবাসের ভেতরের কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত সেনাসদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ভোট দিয়ে থাকেন, যা সামরিক বাহিনীর মনোভাবের একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: অশনি সঙ্কেত সেনাবাহিনীতে?
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কোনও বিশেষ চরমপন্থী রাজনৈতিক আদর্শ থেকে মুক্ত থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেখানে চরম ডানপন্থী বা উগ্র মতাদর্শের প্রতি এক ধরনের ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনাবাহিনীর মতো একটি জাতীয় ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের ভেতরে উগ্র ডানপন্থী আদর্শের এই বিস্তার দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা মনে করেন, যদি সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট কোনো চরমপন্থী আদর্শের প্রতি অনুগত হয়ে পড়ে, তবে তা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো এবং সামরিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ।
অধরা আরও তিন কেন্দ্রের ফলাফল
ঢাকা সেনানিবাসের পাঁচটি প্রধান কেন্দ্রের মধ্যে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, বারিধারা স্কলারস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং বিএএফ শাহীন কলেজের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে না এলেও, হাতে আসা দুটি কেন্দ্রের ফলাফলই ক্ষমতার অলিন্দে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
কেন এবং কীভাবে সেনানিবাসের ভেতরে জামায়াতের এই উত্থান ঘটল, তা নিয়ে গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে।
| কেন্দ্রের নাম | মোট ভোট কাস্ট | তারেক রহমান (বিএনপি) | ড. খালিদুজ্জামান (জামায়াত) |
| ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্র-১ | ৪,১২১ | ১,৯৪২ | ২,০০৩ |
| শহিদ রমিজউদ্দিন কলেজ | ১,৯৪২ (প্রায়) | ৬৮১ | ১,২৬১ |
| পার্থক্য | – | জামায়াত এগিয়ে | দ্বিগুণ ব্যবধান |
উপসংহার
ঢাকা সেনানিবাসের এই ফলাফল কেবল একটি নির্বাচনি হার-জিতের খতিয়ান নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলের প্রধানের চেয়ে ক্যাডার ভিত্তিক দল জামায়াতের প্রতি সেনাসদস্যদের এই ঝোঁক আগামীর রাজনীতি ও সামরিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় এক পরীক্ষা হতে চলেছে।
