আইনের শাসনের বদলে ‘মব জাস্টিস’— ড. ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলের নেতিবাচক উত্তরাধিকার। ৭ শতাধিক প্রাণহানি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে বিদায় নিলেন প্রধান উপদেষ্টা।
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন ২০২৪ সালের আগস্টে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন জনমনে প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশের। কিন্তু দেড় বছর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে তার বিদায়বেলায় সেই প্রত্যাশা রূপ নিয়েছে চরম হতাশায়। বিশ্বদরবারে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে পরিচিত হলেও, দেশের অভ্যন্তরে তার শাসনকাল ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রইল ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির এক অন্ধকার যুগ হিসেবে। দেশের সচেতন মহলে এখন ড. ইউনূসকে নিয়ে একটিই বিতর্কিত উপাধি ঘুরপাক খাচ্ছে— ‘বাংলাদেশের মবের জনক’।
মব জাস্টিসের ভয়াল পরিসংখ্যান: ৭ শতাধিক মানুষের মৃত্যু
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিকে। বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যার সংস্কৃতি এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে মব ভায়োলেন্সে অন্তত ৭ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
এই নিহতের তালিকায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য, নিরীহ শিক্ষক এবং ভবঘুরে মানুষ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ বা রাজপথের উন্মত্ততাকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলেই এই লাশের মিছিল দীর্ঘ হয়েছে।
ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ: যেখানে অরাজকতাই ছিল আইন
কানাডা ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স’ তাদের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ড. ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশে মব লিঞ্চিংয়ের হার পূর্ববর্তী যে কোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলোতে শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনা ড. ইউনূসের প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে সেখানে অরাজকতা ও শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগের হিড়িক ড. ইউনূসের ‘প্যাসিভ’ বা নমনীয় শাসনের দুর্বলতাকেই ফুটে তুলেছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বার্তা না আসায় দুর্বৃত্তরা আইনের তোয়াক্কা করা বন্ধ করে দিয়েছিল।
নখদন্তহীন পুলিশ ও প্রশাসনিক স্থবিরতা
ড. ইউনূস হয়তো জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ মেলাতে দক্ষ, কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রশাসন পরিচালনায় তিনি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।
তাঁর শাসনামলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী ছিল কার্যত ‘নখদন্তহীন’।
রাজপথের দখল ছিল নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর হাতে, যারা মব কালচারের মাধ্যমে দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে:
“ড. ইউনূস জাতিকে এক অনিশ্চিত অরাজকতার গর্তে ঠেলে দিয়ে এখন প্রস্থানের পথে।
তিনি যখন শান্তি ও মানবাধিকারের কথা বলেন, তখন দেশের রাজপথে পড়ে থাকা অজ্ঞাত লাশের মিছিল তাঁর সেই দাবিকে উপহাস করে।”
বিচারহীনতার এক স্থায়ী উত্তরাধিকার
গণতন্ত্র পুনর্গঠনের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ড. ইউনূস একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি রেখে যাচ্ছেন, যা থেকে মুক্তি পাওয়া পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি যে ‘মব কালচার’কে বাড়তে দিয়েছেন, তা সামাজিক সংহতিকে পুরোপুরি বিনষ্ট করেছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রতিহিংসার যে আগুন তিনি নেভাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তার রেশ হয়তো আরও বহু বছর বয়ে বেড়াতে হবে দেশের জনগণকে।
| বিষয় | বিবরণ ও পরিসংখ্যান |
| সময়কাল | আগস্ট ২০২৪ – ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |
| মব লিঞ্চিংয়ে নিহত | ৭০০+ জন (আনুমানিক) |
| প্রধান প্রশাসনিক অভিযোগ | বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা |
| সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা | বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পিটিয়ে হত্যা ও শিক্ষক হয়রানি |
| বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত উপাধি | ‘মবের জনক’ |
উপসংহার
ললাটে ‘মবের জনক’ কলঙ্কতিলক নিয়েই বিদায় নিচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর বিদায়বেলায় জাতি আজ এক দ্বিধাভক্ত ও আতঙ্কিত সমাজের মুখোমুখি।
আইনের শাসন ভুলুণ্ঠিত করে তিনি যে প্রশাসনিক শূন্যতা রেখে গেছেন, তা পূরণ করতে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের ওপর গুরুভার অর্পিত হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় ড. ইউনূস নোবেল বিজয়ী হিসেবে সমাদৃত থাকলেও, এই দেড় বছরের ব্যর্থতা তাঁর জীবনের এক বড় কালো অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।
