বাবা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু ছেলে ইশরাক হোসেনের রাজনীতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আদর্শিক বিচ্যুতি না কি ক্ষমতার আক্রোশ? পড়ুন বিশেষ বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তরাধিকারের লড়াই নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন একজন কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে এমন কোনো রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করেন যা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার পরিপন্থী, তখন সেখানে জন্ম নেয় এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক আক্রোশ। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা পরবর্তী সরকার কাঠামোতে (প্রেক্ষাপট ২০২৬) ইশরাক হোসেনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ঘটনাটি তেমনই এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
বাবার বীরত্বের ইতিহাস দিয়ে কি ছেলের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নই এখন ঢাকার রাজনৈতিক অন্দরমহলে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়।

সাদেক হোসেন খোকা: একটি সোনালী ইতিহাস
অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির প্রয়াত নেতা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন একজন ফ্রন্টলাইন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের রণাঙ্গনে তাঁর সাহসিকতা এবং পরবর্তী জীবনে ঢাকার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর যে সম্মান, তা দল-মতনির্বিশেষে স্বীকৃত। ইশরাক হোসেন যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান, তখন সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো আশা করেছিল, বাবার মতোই তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখবেন।
আদর্শের পথ বনাম আক্রোশের রাজনীতি
কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে পা রাখার পর ইশরাকের রাজনৈতিক গতিবিধি অনেককে বিস্মিত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইশরাক হোসেন বর্তমানে যে রাজনৈতিক বলয়ে নিজেকে আবদ্ধ করেছেন, তা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সাথে অনেকটা আপসকামিতার নামান্তর। সমালোচকরা বলছেন, তিনি তাঁর মুক্তিযোদ্ধা বাবার অর্জিত মর্যাদা ব্যবহার করে এমন এক ‘রাজকারী’ (রাজাকারপন্থী বা প্রতিক্রিয়াশীল) রাজনীতির চাষ করছেন, যা আদতে তিন প্রজন্মের ত্যাগের ওপর এক বিশাল ‘বুলডোজার’ চালানোর মতো
তিন প্রজন্মের আক্রোশ ও ক্ষমতার বুলডোজার
২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর বাড়িটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। ঘোষণা দিয়ে, প্রকাশ্যে, উৎসবের আমেজে। ইনকিলাব মঞ্চ আর শিবিরের লোকজন এক্সক্যাভেটর নিয়ে হাজির হলো। এক্সক্যাভেটর কোথা থেকে এলো? সিটি কর্পোরেশন ছাড়া এই ভারী যন্ত্রপাতি আর কারো কাছে থাকে না, এটা সবাই জানে। ওই সময় ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হিসাবে মেয়র অফিসের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ইশরাক হোসেন নিজেই।
পরে একটা টকশোতে ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেওয়া এক ব্যক্তি মুখ ফসকে বলেও দিলেন যে বুলডোজার দিয়েছিলেন ইশরাক ভাই।
অভিযোগটা প্রমাণিত না, ঠিকই আছে। কিন্তু প্রমাণ না থাকলেই কি সব ঠিকঠাক হয়ে যায়?
যে বাড়ি থেকে একটা জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি তৈরি হয়েছিল, সেই বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কোথায় ছিলেন?
একটা কথাও কি বলেছিলেন? একটা প্রতিবাদও কি করেছিলেন? করেননি। এই নীরবতাটাই আসল কথা বলে দেয়।
ছেলে কী করে, বিচার হবে তা দিয়েই
বাবার বীরত্বগাথা সন্তানের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সন্তানের রাজনৈতিক ভুলের ‘বর্ম’ হতে পারে না।
ইশরাক হোসেন কাদের সাথে ওঠবস করছেন এবং ক্রান্তিলগ্নে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা-ই এখন বিচারের মানদণ্ড।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি এমন কিছু গোষ্ঠীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন যারা একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি এখনও ভুলতে পারেনি।
মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীতন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে বলে দাবি করছেন ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধাগণ
উপসংহার
ইশরাক হোসেনের সামনে সুযোগ ছিল বাবার আকাশচুম্বী মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তাঁর বর্তমান ‘রাজকারী’ রাজনীতির ঝোঁক সেই সুযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসে যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়, তবে ইতিহাস তাঁকে ক্ষমা করবে না।
বিচার কখনোই বংশপরিচয়ে হয় না, বিচার হয় কাজের নিরিখে।
আর ইশরাকের ক্ষেত্রে সেই বিচারের রায় হয়তো খুব একটা সুখকর হবে না।
