বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল। পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত লে. জেনারেল কামরুল হাসানকে সরিয়ে মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে নতুন পিএসও নিয়োগ।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) পদে পরিবর্তন এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রবিবার দুপুরে সেনাসদর থেকে জারি করা এক আদেশের মাধ্যমে এই রদবদল কার্যকর করা হয়। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বর্তমান প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে তার পদ থেকে সরিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল তিনি বাহিনীর ভেতরে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলয় তৈরি করেছিলেন।
বিশেষ করে বিগত মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সময়কালে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনীর যথাযথ অনুমতি ব্যতিরেকেই তিনি পাকিস্তানে সফর করেন এবং একাধিক গোপন সামরিক চুক্তিতে লিপ্ত হন। গত বছরের জানুয়ারিতে তার পাকিস্তান সফরকালে চিনা প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার (JF-17 Thunder) যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়ে পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সাথে তার আলোচনার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
এই বিতর্কিত ভূমিকার কারণেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন পিএসও হিসেবে মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান
লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান।
তিনি এর আগে সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পেশাদারিত্ব এবং শৃঙ্খলার প্রতি আপসহীন এই কর্মকর্তাকে পিএসও হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে বাহিনীর চেইন অফ কমান্ড শক্তিশালী করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পদবঞ্চিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানের প্রত্যাবর্তন
সেনাবাহিনীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ বা চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) পদে বড় পরিবর্তন এসেছে।
সাবেক সিজিএস লে. জেনারেল মিজানুর রহমান শামীমের অবসরের পর পদটি শূন্য ছিল।
সেই পদে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান।
মাইনুর রহমান মেধাবী ও সিনিয়র কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও বিগত সরকারের আমলে কোণঠাসা ছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
তাকে আর্টডকের (ARTDOC) জিওসি থেকে সরিয়ে এখন সেনাবাহিনীর নীতি-নির্ধারণী শীর্ষ পদে নিয়ে আসা হলো।
এটি বাহিনীর ভেতর পেশাদারদের মূল্যায়নের একটি বড় সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনগুলোতে নতুন জিওসি নিয়োগ
সেনাবাহিনীতে এই রদবদলের ঢেউ লেগেছে বিভিন্ন ডিভিশন পর্যায়েও:
- ২৪ পদাতিক ডিভিশন: মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান পিএসও হওয়ায় তার স্থলে নতুন জিওসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান। তিনি এর আগে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ছিলেন।
- ৫৫ পদাতিক ডিভিশন: দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে দায়িত্বরত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাফিজুর রহমানকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়েছে।
- বদলির অন্যান্য তালিকা: মেজর জেনারেল জে এম ইমদাদুল ইসলামকে ৫৫ পদাতিক ডিভিশন থেকে সরিয়ে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত গুরুত্ব
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই পরিবর্তনকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম ‘দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’ এবং ভারতের ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এর আগে জেনারেল কামরুলের পাকিস্তান সফর এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে নয়াদিল্লির এক ধরণের অস্বস্তি ছিল।
বর্তমান রদবদলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনরায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং পেশাদার অবস্থানে ফিরে আসার চেষ্টা করছে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে এর প্রভাব
এই পরিবর্তনের ফলে সেনাবাহিনীর ভেতর যে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হয়েছে তা হলো:
আদর্শিক ভারসাম্য: অতিমাত্রায় কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা রাজনৈতিক বলয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া কর্মকর্তাদের সরিয়ে পেশাদারদের প্রাধান্য দেওয়া।
চেইন অফ কমান্ড: কমান্ড কাঠামোতে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা।
স্বচ্ছতা: বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
উপসংহার: পেশাদারত্বের নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা বিদেশি কোনো শক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করাই এই বাহিনীর মূল শক্তি।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অপসারণ বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,
এই রদবদল সেনাবাহিনীর নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হলেও এর মাধ্যমে মূলত বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
