অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অপসারণ চক্রান্ত, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও সমন্বয়হীনতা নিয়ে মুখ খুললেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বঙ্গভবনে দেড় বছর: যা বললেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
দীর্ঘ দেড় বছর নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অস্বস্তির পর মুখ খুলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাজধানীর বঙ্গভবনে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন—এই সময়ে তাঁকে অপসারণের একাধিক অসাংবিধানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়েছে।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন। রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, “দেড় বছর আমি আলোচনার বাইরে ছিলাম, অথচ আমাকে ঘিরে নানা চক্রান্ত চলেছে।”
‘অপসারণের অসংখ্য ছক’
রাষ্ট্রপতি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁকে সরাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল সক্রিয় ছিল। তাঁর অভিযোগ—“অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।”
তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলেছে এবং একটি পর্যায়ে বিষয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের অবস্থানের কারণে উদ্যোগটি আর এগোয়নি।
রাষ্ট্রপতির দাবি, তাঁকে মানসিকভাবে চাপে ফেলতে বিভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্নে অনড় ছিলেন। তাঁর ভাষায়, “রক্ত ঝরলেও বঙ্গভবন ছাড়তাম না।”
২২ অক্টোবরের বঙ্গভবন ঘেরাও
রাষ্ট্রপতি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ২২ অক্টোবর ২০২৪ সালের বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের ঘটনা। তাঁর বর্ণনায়, সেদিন রাতটি ছিল “বিভীষিকাময়।”
তিনি বলেন, বিভিন্ন দল ও সংগঠনের ব্যানারে রাতারাতি কর্মসূচি তৈরি হয়। নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের সদস্যরা তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও এপিসি ব্যবহার করা হয়।
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, আন্দোলনের কিছু অংশ ছিল “ভাড়াটিয়া” এবং পরিস্থিতিকে অস্থির করার পরিকল্পনা ছিল। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিএনপির ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি স্পষ্টভাবে বলেন, দুঃসময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর পাশে ছিল। বিশেষ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর আন্তরিকতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির দাবি, বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণের বিরোধিতা করে।
তবে এ বিষয়ে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আলাদাভাবে জানা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার ও ড. ইউনূস প্রসঙ্গ
রাষ্ট্রপতির অভিযোগের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করেননি।
সংবিধান অনুযায়ী বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে রিপোর্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, প্রধান উপদেষ্টা একাধিকবার বিদেশ সফরে গেলেও তাঁকে অবহিত করেননি।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পর্কেও তিনি অবগত নন বলে জানান।
তবে এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
‘সাবেক প্রধান বিচারপতিকে বসানোর চেষ্টা’
রাষ্ট্রপতি আরও দাবি করেন, এক পর্যায়ে তাঁকে সরিয়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তাঁর ভাষ্যমতে, সরকারের এক উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকও করেন। কিন্তু ওই বিচারপতি অসাংবিধানিক প্রস্তাবে রাজি হননি।
এই অভিযোগের বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদেশ সফর বাতিল ও কূটনৈতিক আমন্ত্রণ
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আড়ালে রাখার চেষ্টা হয়েছে। কসোভো ও কাতারে গুরুত্বপূর্ণ আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে যেতে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর নামে ‘রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত’ উল্লেখ করে খসড়া চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
এতে তিনি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে আপত্তি জানান।
এ ছাড়া বিদেশে বাংলাদেশ হাইকমিশনগুলো থেকে তাঁর ছবি নামিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে তিনি “অপমানজনক” বলে উল্লেখ করেন।
প্রেস উইং প্রত্যাহার ও এক্সপোজার কমানো
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, বঙ্গভবনের প্রেস উইং পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিকে সরিয়ে
নেওয়ার ফলে তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য পাঠাতে পারেননি। জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রপতির বাণী ও ছবি প্রকাশ বন্ধ থাকার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ ছিল তাঁকে জনসমক্ষে অদৃশ্য রাখার কৌশল।
তিন বাহিনীর অবস্থান
রাষ্ট্রপতি বলেন, তিন বাহিনীর প্রধানরা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তাঁরা হতে দেবেন না।
তিনি উল্লেখ করেন, “রাষ্ট্রপতির পরাজয় মানে সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়”—এমন বার্তা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।
এই দাবির বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা ও বাস্তব ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।
তবে একজন বর্তমান রাষ্ট্রপতির এ ধরনের খোলামেলা বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সাক্ষাৎকার ভবিষ্যৎ
রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সংবিধান, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিতে পারে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
অপসারণ চক্রান্ত, রাজনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক অবমাননা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার মধ্যেও তিনি সংবিধান রক্ষার শপথে অটল ছিলেন বলে দাবি করেছেন।
তবে তাঁর উত্থাপিত একাধিক অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
ফলে বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
