১৮ মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মব ভায়োলেন্সের দায়ে জনরোষের ভয়। সরকারি বাসভবন ছাড়তে অনীহা সাবেক উপদেষ্টাদের। নতুন মন্ত্রীদের আবাসন নিয়ে বাড়ছে জটিলতা।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি মানবাধিকারবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন নাগরিকরা। কিন্তু ১৮ মাস পর হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মব জাস্টিস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার এক গুমোট চিত্র। বর্তমানে সেই ব্যর্থতার দায়ে সৃষ্ট ‘জনরোষ’ থেকে বাঁচতে সাবেক উপদেষ্টারা সরকারি বাসভবন ছাড়তে অনীহা প্রকাশ করছেন।
১৮ মাসের মানবাধিকার রিপোর্ট: আশার অপমৃত্যু
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস-এর ৪ঠা ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭-১৮ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে।
যদিও এই সরকার শুরুতেই মানবাধিকার রক্ষার বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি।
- হেফাজতে মৃত্যু: এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বা নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন ৬০ জন।
- কারাগারে মৃত্যু: ১২৭ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিও রয়েছেন।
- সীমান্ত হত্যা: সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে নিহতের ঘটনাও থামানো সম্ভব হয়নি।
মব জাস্টিসের ভয়াল থাবা: ২৫৯টি তাজা প্রাণ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ছিল ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনি।
এইচআরডব্লিউ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এই বিষয়টিকে গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- পরিসংখ্যান: এই ১৮ মাসে অন্তত ৪১৩টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
- হতাহত: এতে ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ এবং বিচারব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছিল।
জনরোষের আতঙ্ক: কেন বাসা ছাড়তে চাইছেন না সাবেক উপদেষ্টারা?
বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন যে, চব্বিশের আন্দোলনের সমন্বয়কদের চাঁদাবাজি, সুফি মাজার ভাঙচুর, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে হামলা এবং গণহারে মামলার কারণে সাধারণ মানুষের মনে এই সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা সরকারি বাসভবন ছাড়তে ‘অনীহা’ প্রকাশ করছেন।
তাদের মতে, সরকারি বাংলোর দেয়াল যতটা নিরাপদ, বাইরের জগত ততটা অনিরাপদ।
আবাসন পরিদপ্তরের আল্টিমেটাম ও নতুন চ্যালেঞ্জ
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সাবেক উপদেষ্টাদের এই মাসের মধ্যেই আবাসন খালি করতে হবে।
আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, সাবেক উপদেষ্টাদের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী পেনশনার নীতিমালা নেই।
- ভাড়ার বিধান: মার্চ বা এপ্রিল মাসে কেউ অবস্থান করলে তাকে সরকারি হারে চড়া ভাড়া গুনতে হবে।
- যমুনা খালি হচ্ছে: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চলতি মাসেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ ছেড়ে গুলশানের ব্যক্তিগত বাসায় ফিরবেন।
নতুন মন্ত্রিসভার আবাসন সংকট
বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ জনে। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়ার মতো বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে মাত্র ৩৭টি।
- আবেদন জমা: ২১ জন মন্ত্রী ইতিমধ্যে বাসভবনের জন্য আবেদন করেছেন।
- সংস্কার কাজ: যমুনাকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডের বাড়িগুলো দ্রুত মেরামত করে নতুন মন্ত্রীদের বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর
নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) তাদের আন্তর্জাতিক বুলেটিনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রেপ্তার অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতাকে ম্লান করেছে। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মহলে ড. ইউনূসের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ইতিহাসের বিচার
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ক্ষমতার মেয়াদে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার যে মানবাধিকারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন না হওয়ায় আজ তাদেরই ‘জনরোষ’ এড়াতে সরকারি নিরাপত্তায় লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে।
আইনের শাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সেই আইনের অনুপস্থিতিই যে নির্মাতাদের গিলে খায়, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।
