বান্দরবানে হাসনাত আব্দুল্লাহর রহস্যময় সফর ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্ট।
বিশেষ প্রতিবেদক | পার্বত্য চট্টগ্রাম: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর জনপদ। সম্প্রতি এই অঞ্চলে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি আকস্মিক ও গোপন সফরকে কেন্দ্র করে গোয়েন্দা মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ পর্যটকের বেশে তার এই সফরের নেপথ্যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-কে অস্থিতিশীল করার কোনো গভীর ব্লু-প্রিন্ট রয়েছে কি না, তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
ছদ্মবেশে সীমান্ত জনপদে হাসনাত: প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রোববার বান্দরবানের লামা ও আলীকদম সীমান্তে হাসনাত আব্দুল্লাহর উপস্থিতি স্থানীয়দের নজরে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কালো জার্সি, নীল জিন্স এবং মুখে মাস্ক পরে তিনি অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করছিলেন।
তাকে লামা বাজার থেকে শুরু করে মাতামুহুরী নদীর নির্জন এলাকাগুলোতে ঘুরতে দেখা যায়।
কোনো প্রোটোকল ছাড়াই তার এই বিচরণ সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে কেন তাকে এমন ‘গোপন’ রুট ব্যবহার করতে হলো?
সেভেন সিস্টার্স ও মিজোরাম সীমান্ত: কেন এই এলাকা?
ভৌগোলিক দিক থেকে বান্দরবানের সাথে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।
এই গহীন অরণ্য ও দুর্গম পাহাড় ঐতিহাসিকভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
অভিযোগ উঠেছে, হাসনাত গত বছর প্রকাশ্যে ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার যে হুমকি দিয়েছিলেন, এই সফর সেই হুমকিরই একটি মাঠ পর্যায়ের প্রতিফলন।
সীমান্ত পাড়ি দিয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে কোনো বিশেষ সমন্বয় করতেই কি তার এই যাত্রা?
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা যোগসূত্র ও নাশকতার ছক
বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাসনাত আব্দুল্লাহর এই কর্মকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত নয়।
এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং তুরস্কের গোয়েন্দাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের অভিযোগ উঠছে।
সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশি সংযোগ পাওয়া গেছে।
ভারতের অন্যতম সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-র এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের আইএসআই এবং বাংলাদেশের একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী যৌথভাবে ভারতকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করছে।
হাসনাতের এই সফর সেই বৃহত্তর চক্রান্তের একটি অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জঙ্গি পুনরুত্থান ও অস্ত্রের ঝনঝনানি
পার্বত্য অঞ্চলে জঙ্গিবাদের বিষবৃক্ষ নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালে জামায়াত আমিরের ছেলে ডা. রাফাতকে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে শঙ্কা আরও বেড়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের অস্ত্র: সূত্রমতে, গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও স্থাপনা থেকে লুট করা বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এখন পাহাড়ি জঙ্গিদের হাতে।
প্রশিক্ষণ ক্যাম্প: আলীকদম ও লামার গহীন অরণ্যে নতুন করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা হাসনাতের সফরের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে।
আসাদুজ্জামান ফুয়াদের হুঁশিয়ারি ও ঘনীভূত দাঙ্গা আতঙ্ক
এদিকে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ সম্প্রতি তার নেতাকর্মীদের ‘গণঅভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত’ থাকার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা আগুনে ঘি ঢেলেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হাসনাতের গোপন সীমান্ত সফর এবং ফুয়াদের উসকানিমূলক বক্তব্য একই সুতোয় গাঁথা।
এটি দেশে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়াদিল্লি সবসময়ই জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে।
হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো একজন প্রভাবশালী নেতার এই কর্মকাণ্ড দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে যদি ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতার ‘লঞ্চিং প্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তার চরম মূল্য দিতে হতে পারে পুরো অঞ্চলকে।
সাবধানতার সময় এখনই
হাসনাত আব্দুল্লাহর বান্দরবান সফর কেবল একটি পর্যটন সফর ছিল নাকি জঙ্গি কার্যক্রম তদারকির গোপন মিশন, তা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গভীর তদন্তের দাবি রাখে।
দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে উগ্রবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের এই আঁতাতকে সমূলে উৎপাটন করা জরুরি।
অন্যথায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই আগুন সীমান্ত পেরিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
