সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঘুষ ও দুবাইয়ে সম্পদ কেনার অভিযোগ। দলিল ও তদন্তে কী উঠে আসছে?
আহসান মনসুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও পাচারের অভিযোগ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা Bangladesh Bank–এর সাবেক গভর্নর Ahsan H. Mansur–এর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঘুষ গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, বিভিন্ন সূত্র ও দলিলপত্রের তথ্য ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া, ব্যাংক হিসাব জব্দে বাধা দেওয়া এবং বিদেশে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা।
অর্থ পাচার তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়ার পর Anti-Corruption Commission (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে। ৮ এপ্রিল একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংক হিসাব জব্দের অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল Bangladesh Financial Intelligence Unit (বিএফআইইউ)-কে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে থাকা আহসান মনসুর সরাসরি নির্দেশ দেন যেন ওই হিসাবগুলো জব্দ না করা হয়।
শুধু একটি নয়—পোশাকশিল্প খাতের একটি শীর্ষ গ্রুপের বিরুদ্ধে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠার পরও ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
‘গোপন সমঝোতা’ ও ঘুষের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব মামলা ধামাচাপা দেওয়া হয়।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেকের ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার পর তারা সরাসরি গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ‘সমঝোতার’ মাধ্যমে সেই হিসাব খুলে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, প্রায় ১৮ মাসে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিচারিক রায় হয়নি।
দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: দলিলে কী আছে?
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো—দুবাইয়ে ৪৫ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ফ্ল্যাটটি তার কন্যা মেহরিন সারা মনসুরের নামে কেনা হলেও দলিলে আহসান এইচ মনসুরের নামও মালিক হিসেবে রয়েছে।
Dubai Land Department–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফ্ল্যাটটি নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।
দলিলে ক্রেতা হিসেবে আহসান এইচ মনসুর ও মেহরিন সারা মনসুরের নাম উল্লেখ রয়েছে।
দুবাইয়ের সম্পত্তি নিবন্ধন নীতিমালা অনুযায়ী, যদি কেউ কেবল অভিভাবক হন, তবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট দলিলে অভিভাবক হিসেবে আলাদা করে উল্লেখ নেই—যা সরাসরি মালিকানার ইঙ্গিত দেয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
সফরসূচি ও শারীরিক উপস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভ্রমণতথ্য অনুযায়ী, ১৯ ডিসেম্বর তিনি জিবুতি যান, ২২ ডিসেম্বর ইথিওপিয়া এবং একই দিন দুবাই পৌঁছান। ২৪ ডিসেম্বর রাত
পর্যন্ত তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করেন। দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনের সময় ক্রেতার উপস্থিতি ও স্বাক্ষর প্রয়োজন।
দলিলে প্রতিনিধি বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির উল্লেখ না থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, রেজিস্ট্রেশনের সময় তিনি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।
তবে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন—ফ্ল্যাটটি তার কন্যার, এবং তিনি কেবল অভিভাবক হিসেবে নাম দিয়েছেন; বিদেশে কোনো অর্থ পাঠাননি।
আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন
অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয়; বরং দেশের আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় আঘাত। একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের
প্রধান দায়িত্ব হলো অর্থ পাচার প্রতিরোধ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদেশযাত্রায় বিধিনিষেধ আরোপ
এবং সম্পদের উৎস যাচাই করা হতে পারে প্রাথমিক পদক্ষেপ।
সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া
আহসান এইচ মনসুর প্রকাশ্যে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি—বিদেশে কোনো অর্থ পাচার হয়নি
এবং দুবাইয়ের সম্পত্তি আইনসম্মতভাবে কেনা হয়েছে।
অন্যদিকে, দুদক সূত্র বলছে—অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যাচাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
অর্থ পাচারবিরোধী কঠোর অবস্থানের কথা বলা এক সাবেক গভর্নরের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ—এটি নিঃসন্দেহে গুরুতর বিষয়।
অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তি নয়, দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও আস্থাহীনতার সংকট তৈরি করবে। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন স্বচ্ছ,
নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও দলিলগত তথ্যের ভিড়ে সত্য উদ্ঘাটনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
