খামেনির পর ইরানে কি স্থিতিশীলতা আসবে, নাকি বাড়বে অস্থিরতা? ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় বিশ্লেষণ।
ইরান সংকট: খামেনির পর কী অস্থিরতা বাড়বে?
ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও শাসন পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই একটি অংশ মনে করে—বর্তমান শাসনব্যবস্থা দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক ক্ষয় ও সামাজিক স্থবিরতার মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে; তাই বাহ্যিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। অন্যদিকে, সমালোচকেরা সতর্ক করছেন—সহিংস উপায়ে ক্ষমতার কেন্দ্র ভেঙে দিলে তার ফল প্রায়ই অনির্দেশ্য ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ayatollah Ali Khamenei–কে ঘিরে উত্তেজনা, এবং তাঁকে সরিয়ে দিলে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে—এমন ধারণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu প্রকাশ্যে ইরানিদের ‘উঠে দাঁড়াতে’ আহ্বান জানানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন কেন্দ্রীয় নেতার অপসারণ কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তাৎক্ষণিক ও স্থিতিশীল পরিবর্তন আনতে পারে?
মধ্যপ্রাচ্যের পূর্ব অভিজ্ঞতা: সতর্কবার্তা
ইরাক: শাসন পতনের পর দীর্ঘ অস্থিরতা
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আগ্রাসনের মাধ্যমে Iraq–এ শাসন পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু দ্রুত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও গোষ্ঠীগত সংঘাতে দেশটি দীর্ঘদিন বিপর্যস্ত থেকেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, যা পরবর্তী সময়ে জঙ্গি সংগঠনের উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করএ।
লিবিয়া: রাষ্ট্র ভাঙনের নজির
২০১১ সালে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর Libya কার্যত দুই ক্ষমতাকেন্দ্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে—ত্রিপোলি ও বেনগাজি। একসময় তুলনামূলক স্থিতিশীল দেশটি গৃহযুদ্ধ, মিলিশিয়া রাজনীতি ও প্রশাসনিক ভাঙনের মধ্যে পড়ে যায়।
আফগানিস্তান: দীর্ঘ যুদ্ধের চক্র
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের পর Afghanistan–এ শাসন পরিবর্তন হলেও দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামেনি। ২০২১ সালে পূর্বতন শক্তির প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে—বাহ্যিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা স্থায়ীভাবে বদলানো কঠিন।
এই তিনটি উদাহরণই দেখায়—শাসক অপসারণ মানেই স্থিতিশীল পুনর্গঠন নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে।
ইরানের ভিন্ন বাস্তবতা
Iran–এর রাজনৈতিক কাঠামো আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতো নয়। এখানে শক্তিশালী আমলাতন্ত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও আধা-সামরিক কাঠামো সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসব প্রতিষ্ঠান অক্ষত থাকে, তবে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে নেতৃত্বহীনতা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
‘শহীদির বয়ান’ ও জাতীয়তাবাদ
ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী শিয়া ইসলামের অনুসারী। এই ধর্মীয়-প্রতীকী কাঠামোর ভেতরে কোনো নেতার সহিংস মৃত্যু ‘শাহাদাত’ হিসেবে ব্যাখ্যা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে খামেনির মৃত্যু—যদি তা সহিংস প্রেক্ষাপটে ঘটে—তাহলে তা শাসনব্যবস্থার পতনের বদলে উল্টো জাতীয়তাবাদী সংহতি জোরদার করতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, ‘বিদেশি আগ্রাসনের শহীদ’ বয়ান জনমতকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, এমনকি সমালোচকদেরও নিরাপত্তা-নির্ভর অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে।
সম্ভাব্য উত্তরাধিকার সংকট
বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বজনগ্রাহ্য ‘জাতীয় ঐক্যের মুখ’ অনুপস্থিত। সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf,
সাবেক প্রেসিডেন্ট Hassan Rouhani বা প্রভাবশালী রাজনীতিক Ali Larijani–এর নাম আলোচনায় থাকলেও তাঁদের কারও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব খামেনির সমতুল্য নয়।
যদি ‘প্রযুক্তিবিদ-সামরিক পরিষদ’ ধরনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গঠিত হয়, তবে তা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।
কিন্তু জনতার ক্ষোভ ও নিরাপত্তা কাঠামোর আত্মরক্ষামূলক মানসিকতার মধ্যে যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা কঠিন হবে।
অস্থিরতার ঝুঁকি: ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্য
ইরানের জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে বেশি। সীমান্ত অঞ্চলে বালুচ, কুর্দি ও আরব জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, আইআরজিসি বা বাসিজের কট্টর অংশ নিজেদের
অস্তিত্ব হুমকির মুখে দেখলে তারা বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
তিক্ত সমাপ্তি, না দীর্ঘ অস্থিরতা?
বিদেশি হস্তক্ষেপের সমর্থকেরা প্রায়ই যুক্তি দেন—‘অন্তহীন তিক্ততার চেয়ে তিক্ত সমাপ্তি ভালো’।
কিন্তু ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের ইতিহাস দেখায়, সহিংস সমাপ্তি প্রায়ই দীর্ঘ অস্থিরতার সূচনা করে।
খামেনির মৃত্যু একটি যুগের প্রতীকী ইতি টানতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অক্ষত না থাকলে, কিংবা নিরাপত্তা কাঠামো বিভক্ত হলে,
তার ফল হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা। ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেয়ে বেশি—প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতি,
প্রশাসনিক ঐক্য ও সামাজিক সংহতির ওপর। অতএব, শাসন পরিবর্তনের প্রশ্নে দ্রুত সমাধানের ধারণা যতটা আকর্ষণীয়,
বাস্তবতা ততটাই জটিল। ইতিহাস বলছে—রাষ্ট্র ভাঙা সহজ; স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন অনেক কঠিন।
