সীতাকুণ্ডে গলাকাটা শিশু থেকে ঈশ্বরদীতে দাদি-নাতনি হত্যা; গত ৫ দিনে বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র। রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: মানচিত্র জুড়ে কেবলই রক্তের দাগ। গত পাঁচটি দিন বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস যেন কন্যাসন্তানদের আর্তনাদে ভারী হয়ে আছে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসা সেই দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুটি, যার কথা বলার শক্তিটুকু কেড়ে নিয়েছে ঘাতকের ধারালো ছুরি, সে যেন আজ স্তব্ধ বাংলাদেশের এক জীবন্ত প্রতীক। তাহিয়া, আমেনা, তাবাসসুম, শারমিন আর জামিলা—প্রতিটি নাম গত পাঁচ দিনে আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্র যেখানে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, সমাজ যেখানে কেবল ‘ট্রেন্ড’ নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে এই কন্যাসন্তানদের বিচার নিশ্চিত করবে কে?
সীতাকুণ্ডের সেই আর্তনাদ: গলাকাটা অবস্থায় জীবনের লড়াই
গত ১ মার্চ সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকায় যা ঘটেছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
জঙ্গল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটি যখন টলমল পায়ে হেঁটে আসছিল, তখন তার কণ্ঠনালী কাটা থাকায় সে চিৎকারও করতে পারছিল না।
শিশুটি বর্তমানে চমেক হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, মেয়েটিকে কুমিরা এলাকা থেকে তুলে আনা হয়েছিল।
ঝিনাইদহে সেফটিক ট্যাংকে ৫ বছরের তাবাসসুম
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে পাঁচ বছরের শিশু তাবাসসুমের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন।
বৃহস্পতিবার নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয় সেফটিক ট্যাংক থেকে।
- তদন্তের ফল: অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজালের মতে, প্রতিবেশী যুবক আবু তাহের ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে।
- জনরোষ: হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে মহেশপুরে উত্তাল মানববন্ধন পালিত হয়েছে।
ঈশ্বরদীতে দাদি ও নাতনি জামিলার মর্মান্তিক পরিনতি
পাবনার ঈশ্বরদীতে গত শুক্রবার রাতে যে বীভৎসতা চলেছে, তা পুরো জেলাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
৭০ বছরের বৃদ্ধা সুফিয়া বেগমকে হত্যার পর তার ১৬ বছরের নাতনি জামিলা খাতুনকে তুলে নিয়ে গিয়ে মাঠের মাঝে ধর্ষণ ও হত্যা করে শরিফুল ইসলাম নামের এক পাষণ্ড।
পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ জানান, ঘাতক শরিফ নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে।
জামিলার বাবা জয়নাল খা কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় থাকায় বাড়িতে কেবল দাদি-নাতনিই থাকতেন, এই সুযোগটিই নিয়েছিল ঘাতক।
রাজধানী ও জেলাগুলোতে মরদেহের মিছিল
গত কয়েক দিনে নারী ও শিশু নির্যাতনের এই ধারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে:
- হাজারীবাগের শারমিন বিন্তি: বুধবার রাতে স্কুলছাত্রী বিন্তিকে তার তথাকথিত প্রেমিক সিয়াম মাদকাসক্ত অবস্থায় নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পুলিশের দাবি এটি প্রেমের সম্পর্কের পরিণতি হলেও পরিবারের দাবি এটি ছিল দীর্ঘদিনের হয়রানির চূড়ান্ত রূপ।
- হাতিরঝিলের তাহেদী: ৬ বছরের তাহেদীর রহস্যজনক মৃত্যু এবং সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
- নরসিংদীর আমেনা: ধর্ষণের পর বিচার চাইতে গিয়ে বাবার সামনেই হ*ত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে ১৫ বছরের এই কিশোরী।
নীরব রাজনৈতিক দল ও ‘তৌহিদী’ সমাজ: কেন এই নির্লিপ্ততা?
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই নিষ্পাপ শিশুগুলোর রক্তে ভেজা জামা দেখেও রাজপথ উত্তাল হয় না।
কোনো বড় রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠন এই কন্যাসন্তানদের জন্য মব করে না।
বিদেশ থেকে কোনো পাউন্ড বা ডলার আসে না এই নির্যাতনের প্রতিবাদ করার জন্য।
ফেসবুক বা ইউটিউবে আমরা হয়তো দুই দিন কথা বলি, কিন্তু নতুন কোনো ইস্যু এলেই আমরা ভুলে যাই সীতাকুণ্ডের সেই রক্তাক্ত গলাকাটা শিশুটিকে।
আমাদের এই ‘সিলেক্টিভ প্রতিবাদ’ অপরাধীদের আরও বেশি সাহসী করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও বাংলাদেশের অবস্থান
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন এবং ইউনিসেফ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বারবার শিশুদের ওপর সহিংসতা রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে সাধারণ মানুষের আইনের শাসনের ওপর আস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে যখন ‘নির্ভয়া’ বা ‘কাঠুয়া’ কাণ্ড ঘটে, তখন সেখানে গোটা দেশ অচল হয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশে সীতাকুণ্ড থেকে ঈশ্বরদী—প্রতিটি ঘটনায় ঘাতকের উল্লাস কেবল আমাদের ব্যর্থতারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
রাষ্ট্র ও আমাদের দায়
গলাকাটা অবস্থায় জঙ্গলে হাঁটতে থাকা সেই সাত বছরের শিশুটি কেবল ইশারায় অপরাধীকে চিনিয়ে দিতে চাইছে।
কিন্তু রাষ্ট্র কি পারবে তাকে সেই ইনসাফ দিতে? গত ৫ দিনের এই রক্তাক্ত বাংলাদেশ আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হোক বা সংস্কার—কন্যাসন্তানদের জীবনের নিরাপত্তা যদি না থাকে, তবে এই ‘নতুন বাংলাদেশ’ অর্থহীন।
আজ তাহিয়া-আমেনাদের জন্য আমরা না দাঁড়ালে কাল হয়তো আপনার-আমার পরিবারের কেউ এই তালিকার পরবর্তী নাম হবে।
শৈশব যেন আর রক্তাক্ত না হয়; রাষ্ট্রকে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দ্রুততম সময়ে এই ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
