সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের বিশেষ সাক্ষাৎকার। ইউনূস সরকারের ভেতরে থাকা ‘কিচেন কেবিনেট’, লুট হওয়া অস্ত্র ও পররাষ্ট্রনীতির দিল্লির প্রভাব নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের একটি সাম্প্রতিক টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রথমবারের মতো তিনি মুখ খুলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল এবং নিরাপত্তা খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরেও ছিল এক শক্তিশালী ‘কিচেন কেবিনেট’, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো সংশ্লিষ্ট অনেক উপদেষ্টাকে পাশ কাটিয়ে।
‘কিচেন কেবিনেট’ ও নীতিনির্ধারণী বিচ্ছিন্নতা
সাক্ষাৎকারে সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, সরকার প্রধানের অত্যন্ত আস্থাভাজন কয়েকজনকে নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক ও প্রভাবশালী বলয় কাজ করত। তিনি একে ‘কিচেন কেবিনেট’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, দেশ যখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছিল, তখন তাকে নীতিনির্ধারণী অনেক আলোচনায় ডাকা হতো না। সাখাওয়াত হোসেনের ধারণা, তিনি সত্য বলতে পিছপা হবেন না এবং অনেক বিতর্কিত বিষয়ে একমত হবেন না—এমন পূর্ব ধারণা থেকেই তাকে এই ঘনিষ্ঠ পরিসর থেকে বাইরে রাখা হয়েছিল।
লুণ্ঠিত চার হাজার রাইফেল ও নিরাপত্তার ক্ষত
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালীন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন জানান, ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
তিনি উল্লেখ করেন, সারা দেশের বিভিন্ন থানা থেকে প্রায় চার হাজার রাইফেল লুট করা হয়েছিল।
পুলিশ সদস্যরা মাঠ ছাড়ার উপক্রম করলে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
সাখাওয়াত হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বিপুল সংখ্যক লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা ভবিষ্যতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
টাইপ-৩৯ রাইফেল রহস্য ও সন্দেহজনক উপস্থিতি
সাবেক এই উপদেষ্টা ৭.৬২ ক্যালিবারের চিনা টাইপ-৩৯ রাইফেলের ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে এক রহস্যময় ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি জানান, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে সাধারণ মানুষের হাতে বা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের কাছে এই সমরাস্ত্র দেখা গেছে।
পুলিশের অস্ত্রাগারে এই বিশেষ ক্যালিবারের অস্ত্র কীভাবে এল এবং কারা তা ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে তিনি তদন্ত করতে চেয়েছিলেন।
তবে দায়িত্ব থেকে দ্রুত অপসারণের ফলে তার সেই অনুসন্ধানী মিশন থমকে যায়।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভূ-চিত্র: জামায়াতের উত্থান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই শতভাগ নির্ভুল নির্বাচন সম্ভব নয়। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭টি আসন প্রাপ্তিকে তিনি দেশের রাজনীতিতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, এটি রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
‘দিল্লিকেন্দ্রিক’ পররাষ্ট্রনীতি ও জনগণের ক্ষোভ
পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অতীতে নীতিনির্ধারণে এক ধরণের ‘দিল্লিকেন্দ্রিক’ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
এই প্রবণতা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং এটি সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরণের ছায়া ফেলেছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রনীতিতে যে নতুন ধারা সূচিত হয়েছে, তাকে তিনি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
চুক্তি ও বিনিয়োগে গোপনীয়তার বিতর্ক
মার্কিন জ্বালানি কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং অন্যান্য বড় চুক্তির ক্ষেত্রে ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ বা গোপনীয়তার শর্ত নিয়ে তিনি কথা বলেন।
সাখাওয়াত হোসেনের মতে, অফশোর খাতে উন্নত প্রযুক্তির অভাব পূরণে বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য হলেও বাণিজ্যের আড়ালে অনেক সময় আন্তর্জাতিক চাপের মোকাবিলা করতে হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেনের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এ প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়ার নীতিনির্ধারণী সংকটের চিত্রকেই সমর্থন করে।
বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ‘পাওয়ার স্ট্রাগল’ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্র লুট হওয়ার ঘটনা নিয়ে ইতিপূর্বে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
সাখাওয়াতের মন্তব্য ও আগামীর রাজনীতি
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে সব কিছু স্বাভাবিক ছিল না।
‘কিচেন কেবিনেট’-এর মতো ধারণাগুলো গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তার এই বক্তব্যের পর জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কি আসলেই যোগ্যতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, না কি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাবে?
তার এই গোমর ফাঁস আগামীর রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন রসদ জোগাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
