বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে এনবিআর। সিপিডির আশঙ্কা, ডব্লিউটিও নীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট।
প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, এই চুক্তির ফলে কেবল চলতি অর্থবছরেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক হাতছাড়া হতে পারে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ ২০২৬) ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সিপিডি জানায়, এই একতরফা শুল্ক ছাড় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সার্বভৌম বাণিজ্য নীতি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
শুল্কমুক্ত সুবিধায় রাজস্বের বড় ক্ষত
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, নতুন চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি পণ্যে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করতে হচ্ছে। এছাড়া আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মেয়াদে আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এই বিশাল সংখ্যক পণ্যে ছাড় দেওয়ার ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর আমদানি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় বড় ধরণের ধস নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ড. ফাহমিদার মতে, এই চুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফা সুবিধা দিচ্ছে, যার বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি বা রপ্তানি সুবিধার বিষয়টি যথেষ্ট অস্পষ্ট।
ডব্লিউটিও নীতি ও বৈশ্বিক আইনি ঝুঁকি
সিপিডির মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ (MFN) নীতির মারপ্যাঁচে পড়তে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও-এর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি অন্য কোনো সদস্য দেশকে বিশেষ শুল্ক ছাড় দেয়, তবে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই ধরণের সুবিধা দাবি করার আইনি অধিকার রাখে।
ড. ফাহমিদা বলেন, “যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা চীন একই ধরণের সুবিধা দাবি করে, তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সারা বিশ্বের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এটি আমাদের দেশীয় শিল্পায়নকে সরাসরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।”
বাজেটের ওপর বাড়তি চাপের পরিসংখ্যান
সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের আগে বর্তমান অর্থবছরের আর্থিক সূচকগুলো মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
- রাজস্ব ঘাটতির চিত্র: চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, কিন্তু অর্জিত হয়েছে মাত্র ১২.৯ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বাকি সময়ে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা প্রায় অসম্ভব।
- এডিপি বাস্তবায়নে স্থবিরতা: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (২০.৩%) নেমে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের সক্ষমতা কমেছে।
এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও রাজস্ব চিত্র (সিপিডি তথ্য)
| সূচক | বর্তমান অবস্থা / লক্ষ্যমাত্রা | সিপিডির পর্যবেক্ষণ |
| রাজস্ব প্রবৃদ্ধি (জানুয়ারি পর্যন্ত) | ১২.৯% (লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫%) | লক্ষ্য অর্জনে ৫৯.৪% প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন (অসম্ভব) |
| রাজস্ব ঘাটতি | ৬০,০০০ কোটি টাকা | আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ |
| এডিপি বাস্তবায়ন হার | ২০.৩% | গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হার |
| ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ | ৫৯,৬৫৫ কোটি টাকা (ডিসেম্বর পর্যন্ত) | বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে |
বেসরকারি খাতের বাধ্যবাধকতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই চুক্তির একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হবে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—ব্যবসায়ীরা কেন বেশি দাম দিয়ে বা নির্দিষ্ট শর্ত মেনে কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে?
সরকারকে যদি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হয়, তবে সেখানে বড় অংকের ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেটের ওপর নতুন বোঝা তৈরি করবে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “বাণিজ্য এখন ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য কেনার শর্ত বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আমরা কোথা থেকে পণ্য কিনব, সেই সিদ্ধান্ত যদি চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়।”
ব্যাংক ঋণের বোঝা ও বেসরকারি খাতের সংকট
রাজস্ব আদায়ে বড় ধরণের ঘাটতি থাকায় সরকার এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ঋণ নিয়েছে।
- ঋণের প্রভাব: সরকার যখন ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়, তখন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের যোগান কমে যায়। এতে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মন্দা দেখা দেয়।
- বিদেশি সহায়তা হ্রাস: লক্ষ্য করা গেছে যে, সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের দিকে ঝুঁকছে কারণ বৈদেশিক সহায়তা এবং ব্যাংক-বহির্ভূত ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে।
সিপিডি মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের বড় অংশের জ্বালানি যেহেতু ওই অঞ্চল থেকেই আসে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের বাজারে বিদ্যুৎ ও পরিবহণ ব্যয় বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সিপিডির সুপারিশমালা
আসন্ন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সিপিডি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছে:
- উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বর্জন: অবাস্তব রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা না ধরে বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করা।
- রাজস্ব সংস্কার: কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমানে এই হার মাত্র ৬.৮ শতাংশ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন: সরকারি কেনাকাটা এবং মেগা প্রজেক্টের নামে অপচয় বন্ধ করে কৃচ্ছ্রসাধন করা।
- বাণিজ্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভারসাম্য আনা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কার্যকারিতা কমে আসা এবং বড় শক্তিগুলোর ‘ট্রেড প্রোটেকশনিজম’ বা বাণিজ্য সুরক্ষা নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ এবং ‘ব্লুমবার্গ’ একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নীতি কীভাবে ছোট দেশের অর্থনীতিকে চাপে রাখে, তা নিয়ে বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সিপিডির এই গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনা সেই বৈশ্বিক আশঙ্কারই একটি প্রতিফলন।
সাবধানতার সময় এখনই
সিপিডির গোলটেবিল বৈঠকের মূল নির্যাস হলো—বাংলাদেশ একটি গভীর অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে রাজস্ব আদায়ে ধস, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে শুল্ক হারানোর ভয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে যদি না এর শর্তাবলি দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।
বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে টেকসই আর্থিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
নীতিনির্ধারকরা যদি সিপিডির এই তথ্যনিষ্ঠ সুপারিশগুলো আমল না দেন, তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
