শিলিগুড়ি-পার্বতীপুর তেল পাইপলাইন এখন বাংলাদেশের জ্বালানি শক্তির মূল উৎস। রাজনৈতিক বিতর্ক ছাপিয়ে কীভাবে এটি দেশের অর্থনীতিতে আশীর্বাদ হয়ে উঠল।
বিশেষ প্রতিবেদক | পার্বতীপুর, দিনাজপুর
এক সময় যে প্রকল্পকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে ‘দেশ বিক্রি’ কিংবা ‘সার্বভৌমত্ব বিসর্জন’-এর মতো চড়া সুরের স্লোগান শোনা গিয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে সেই অবকাঠামোটিই এখন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অকাট্য স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ১৩১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন’ (IBFPL) এখন কেবল একটি যান্ত্রিক সংযোগ নয়, বরং উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের এক জীবনীশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
‘দেশ বিক্রি’র অভিযোগ বনাম বাস্তবতার জয়
যেকোনো বড় দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পের শুরুতেই বাংলাদেশে এক ধরণের রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা যায়। এই পাইপলাইন প্রকল্পটি যখন হাতে নেওয়া হয়, তখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল—এটি ভারতের ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেবে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু অপারেশনের কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, এটি কোনো রাজনৈতিক দাসত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিক সাশ্রয় এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের একটি আধুনিক কৌশল মাত্র।
অবকাঠামোগত পরিচিতি: শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর
এই পাইপলাইনটি ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি (NRL) থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর রেলহেড ডিপো পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৩১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের মধ্যে বাংলাদেশের অংশে পড়েছে ১২৬.৫ কিলোমিটার এবং ভারতের অংশে ৫ কিলোমিটার। এটি মূলত উচ্চমানের ডিজেল (Gas Oil) পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের কৃষিতে নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গকে বলা হয় ‘শস্যভাণ্ডার’। এই অঞ্চলের সেচ পাম্প এবং কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেলের প্রয়োজন হয়।
ইতিপূর্বে চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর থেকে রেল ওয়াগন বা নৌপথে তেল পার্বতীপুর আনতে যেমন সময় লাগত, তেমনি ব্যয়ও ছিল অনেক বেশি।
মৈত্রী পাইপলাইন চালু হওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে তেল পার্বতীপুর পৌঁছে যাচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনে খরচ কমাতে সরাসরি সাহায্য করছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় সক্ষমতার মাইলফলক
এই পাইপলাইনের বার্ষিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে বছরে বড় অংকের ডিজেল আমদানি করছে।
সংকটের সময় যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন এই পাইপলাইন ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে।
বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন আর জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে না।
বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যয়ের সাশ্রয়
ডলার সংকটের এই সময়ে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানো সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহনে সময় ও অর্থের যে সাশ্রয় হচ্ছে, তা সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করছে।
রেল ওয়াগনের ভাড়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমে যাওয়ায় বিপিসি (BPC) প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করতে সক্ষম হচ্ছে।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ
এক সময় যারা এই পাইপলাইনকে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি মনে করতেন, তারা এখন স্বীকার করছেন যে আধুনিক বিশ্বে ‘এনার্জি কানেক্টিভিটি’ বা জ্বালানি সংযোগ একটি স্বাভাবিক বিষয়। ইউরোপের দেশগুলো একে অপরের সাথে গ্যাস ও তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে যুক্ত।
বাংলাদেশ ও ভারতের এই সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি গ্রিড তৈরির পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পরিকল্পনা
পাইপলাইনটি অত্যন্ত সফল হলেও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই লাইনের ছিদ্র বা নাশকতা রোধে সর্বাধুনিক সেন্সর ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
এছাড়া ভবিষ্যতে ডিজেলের পাশাপাশি এই পাইপলাইন দিয়ে অন্য কোনো জ্বালানি পণ্য আনা যায় কি না, তা নিয়েও সমীক্ষা চলছে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মিডিয়া রেফারেন্স
ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘রয়টার্স’ এবং ‘আল-জাজিরা’ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সেখানে বলা হয়েছে যে, এই প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি নতুন মডেল।
এটি কেবল দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করার একটি উদাহরণ।
বিতর্ক নয়, উন্নয়নই হোক পরিচয়
রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবেই, কিন্তু দেশের স্বার্থে নেওয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে কেবল দলীয় চশমায় বিচার করা যে ভুল ছিল, তা আজ মৈত্রী পাইপলাইন প্রমাণ করেছে। যে পাইপলাইনকে ‘দেশ বিক্রি’র ষড়যন্ত্র বলা হয়েছিল, আজ সেই পাইপলাইনের তেলেই চলছে উত্তরবঙ্গের ট্রাক্টর আর সেচ পাম্প। এই নীরব বিপ্লবই বলে দেয়, সঠিক পরিকল্পনা ও সৎ সাহস থাকলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি দেশ কীভাবে তার জ্বালানি ভিত্তি মজবুত করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ জ্বালানি নিরাপত্তার যে শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে এই পাইপলাইনের অবদান অনস্বীকার্য।
