জামিন পেলেও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার বা শ্যেন অ্যারেস্ট নিয়ে ডেভিড বার্গম্যানের উদ্বেগ। তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান বাস্তবতার বৈপরীত্য নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে ‘জামিন’ এবং ‘পুনরায় গ্রেপ্তার’ একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিতর্কিত অধ্যায়। সম্প্রতি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ দেশের বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে নতুন করে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও নতুন নতুন মামলায় ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ বা শ্যেন অ্যারেস্ট-এর এই সংস্কৃতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। তার মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে আইনের এই অপব্যবহার কেবল বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন করছে না, বরং তা এক গুরুতর মানবাধিকার সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জামিনের পর নতুন মামলার বেড়াজাল: খায়রুল হক ও আইভী প্রসঙ্গ
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক একাধিক মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই তাকে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই মামলার মূল প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) তার নাম ছিল না। একই ধরণের পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী।
বার্গম্যানের মতে, কোনো ব্যক্তিকে কারাগারে আটকে রাখার জন্য যখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই একের পর এক মামলায় যুক্ত করা হয়, তখন আদালতের দেওয়া ‘জামিন’ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। এটি কেবল ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ নয়, বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি পদ্ধতিগত লঙ্ঘন।
তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান
নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ‘আইনের শাসন’ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের (Reconciliation) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিরসনের প্রশ্নে তার উত্তর ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক।
তবে ক্ষমতা গ্রহণের এক মাসের মাথায় আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর ‘শ্যেন অ্যারেস্ট’-এর অব্যাহত নির্ভরতা দেখে বার্গম্যান প্রশ্ন তুলেছেন—প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রতিশ্রুতি কি কেবল কথার কথা ছিল? তিনি মনে করেন, আইনের শাসনের চেয়ে যদি রাজনৈতিক প্রতিশোধ চরিতার্থ করার প্রবণতা বড় হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
শ্যেন অ্যারেস্ট: যখন আইন হয় নিপীড়নের হাতিয়ার
আইনের ভাষায় ‘শ্যেন অ্যারেস্ট’ বা ‘শোন অ্যারেস্ট’ একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া হলেও এর রাজনৈতিক অপব্যবহার বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের। বার্গম্যানের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, অতীতে যে ধরণের আইনের অপব্যবহার আমরা দেখেছি, বর্তমান সরকারও যদি সেই একই পথে হাঁটে, তবে তা অতিতের দুঃশাসনেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।
- সাংঘর্ষিক নীতি: উচ্চ আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে নিম্ন আদালতের মাধ্যমে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
- মানবাধিকার উদ্বেগ: আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আটকে রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।
বিচারিক সংস্কার ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ (এক নজরে)
| প্রসঙ্গ | অতীত চিত্র | বর্তমান বাস্তবতা (২০২৬) | বার্গম্যানের পর্যবেক্ষণ |
| আইনের শাসন | রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ | সংস্কারের প্রতিশ্রুতি | ‘শোন অ্যারেস্ট’-এর ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি |
| জামিন প্রক্রিয়া | জামিন পরবর্তী হয়রানি | উচ্চ আদালতের সক্রিয়তা | জামিন হলেও মুক্তি না পাওয়া ‘উদ্বেগজনক’ |
| রাজনৈতিক প্রতিহিংসা | বিরোধী দমন-পীড়ন | জাতীয় ঐক্যের ডাক | প্রতিপক্ষকে দমাতে পুরনো পদ্ধতির প্রয়োগ |
| জনগণর আস্থা | বিচার বিভাগের ওপর আস্থার অভাব | নতুন আশায় বুক বাধা | আস্থা দ্রুত ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি |
রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন ও আইনের শাসন
ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একমাত্র পথ হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। যদি আওয়ামী লীগ সমর্থক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপরাধ করে থাকেন, তবে তাদের স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ‘ভুতুড়ে মামলা’ বা নামহীন এফআইআরে নাম ঢুকিয়ে আটকে রাখা কখনো আইনের শাসন হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করতে হলে সরকারকে এই ‘গ্রেপ্তার দেখানো’র সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট
একটি দেশের গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড হলো তার বিচার বিভাগ। যখন সাধারণ মানুষ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দেখেন যে উচ্চ আদালতের জামিন আদেশ নির্বাহী বিভাগের কৌশলের কাছে হেরে যাচ্ছে, তখন বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যায়। বার্গম্যান সতর্ক করে বলেন, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে বিচার বিভাগ কেবল কাগজ-কলমেই স্বাধীন থাকবে, বাস্তবে তা নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক সংবাদপত্রের নজর
বাংলাদেশের এই বিচারিক কর্মকাণ্ড কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত হচ্ছে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ‘বিবিসি’-এর মতো গণমাধ্যমগুলো ইতিপূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক মামলার সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বার্গম্যানের এই নতুন বিশ্লেষণটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের কারণ হতে পারে।
সুশীল সমাজের ভূমিকা ও আগামীর করণীয়
দেশের সুশীল সমাজ এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট নিরসনে বিচার বিভাগকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
উচ্চ আদালতের উচিত সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া যাতে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিনা কারণে নতুন মামলায় যুক্ত না করা হয়।
এছাড়া পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, আজ যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, কাল তারাই আবার এই ব্যবস্থার শিকার হতে পারে।
প্রতিশ্রুতি না কি সংস্কার?
বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রত্যাশায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ‘আইনের শাসন’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
সাবেক প্রধান বিচারপতি বা মেয়রের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যদি শ্যেন অ্যারেস্টের মতো বিতর্কিত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, তবে তা তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ বার্তা দেয়।
বার্গম্যানের বিশ্লেষণটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে আসা উচিত। আইনের শাসন মানে কেবল নিয়ম মানা নয়, বরং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
সরকার যদি তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চায়, তবে বিচারব্যবস্থাকে সত্যিকারের অর্থে স্বাধীন ও হস্তক্ষেপমুক্ত করতে হবে।
নতুবা ‘আইনের শাসন’ কথাটি কেবল একটি জনপ্রিয় স্লোগান হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।
