শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সত্য নিয়ে ভাই ওমর হাদির ফেসবুক পোস্ট। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যদের কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে কেন এই ইঙ্গিত?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং শোকাবহ ঘটনা ছিল ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই মৃত্যুকে ঘিরে পুনরায় নতুন রহস্যের দানা বাঁধছে। এবার কোনো তৃতীয় পক্ষ নয়, বরং নিহতের নিজের ভাই শরিফ ওমর হাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক চাঞ্চল্যকর বার্তা দিয়েছেন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে দেওয়া তার সেই ফেসবুক স্ট্যাটাসটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়, যা ইনকিলাব মঞ্চের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে কী ছিল? আগাম ক্ষমার নেপথ্যে কোন রহস্য?
শরিফ ওমর হাদি তার ফেসবুক পোস্টে অত্যন্ত স্পষ্ট অথচ রহস্যময় ভাষায় লিখেছেন যে, তিনি তার ভাই শরিফ ওসমান হাদির জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের এক বিস্তারিত বিবরণ জনসমক্ষে আনতে যাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই সত্য প্রকাশের আগে তিনি ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যদের কাছে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন।
তার ভাষায়, “আমার ভাই ওসমান হাদি হ/ত্যা/র আগে এবং পরে তার সাথে ঠিক কি ঘটেছিল এ নিয়ে আমি বিস্তারিত লিখবো। অনেক লেখা ভাইদের বিরুদ্ধে যাবে এজন্য আমাকে মাফ করবেন।”
এই একটি বাক্যই রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
যদি ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা হাদির খুব কাছের লোক হয়ে থাকেন, তবে তাদের ‘বিরুদ্ধে’ কেন কথা যাবে?
তবে কি কোনো ঘরোয়া কোন্দল বা অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সংঘাত এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনে ছিল?

অতীতের সেই রক্তঝরা ডিসেম্বর: হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকায় দিনের আলোয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপত্র ও আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।
পরবর্তীতে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
কিন্তু দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং তার মরদেহ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।
“সত্য কখনও চাপা থাকে না। হাদির নিজের রক্ত যখন কথা বলতে শুরু করেছে, তখন বুঝতে হবে এই হত্যাকাণ্ডের শেকড় অনেক গভীরে।”
ইনকিলাব মঞ্চের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও জনমানসের প্রতিক্রিয়া
শরিফ ওমর হাদির পোস্টের নিচে সাধারণ মানুষের মন্তব্যগুলোও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
মোঃ আশরাফ হোসেন’ নামের একজন মন্তব্য করেছেন, “হাদীকে ওরা অনেক ব্যবসা করেছে। সময় এসেছে সত্য বলার।”
এই মন্তব্যটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, হাদির নাম ব্যবহার করে হয়তো কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের ফায়দা লুটেছে।
অন্যদিকে ‘রঙীন মেহেদী’ বা ‘মোঃ নিজাম উদ্দিন হিরো’র মতো ব্যক্তিরা এই সত্য প্রকাশের ফলে তদন্ত বা সত্য উদঘাটনে কোনো বাধার সৃষ্টি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তবে সিংহভাগ মানুষই মনে করছেন, সত্য যত তেতোই হোক, তা বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক নীরবতা ও নতুন তদন্তের দাবি
হাদি হত্যাকাণ্ডের পর এতদিন পেরিয়ে গেলেও এর মাস্টারমাইন্ড কারা ছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
ওমর হাদির এই ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্টটি কি তবে প্রশাসনের জন্য কোনো সংকেত?
যদি ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যদের কারও সংশ্লিষ্টতা থেকে থাকে, তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে অবশ্যই নতুন করে ফাইল ওপেন করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক সময় রাজনৈতিক সহকর্মীদের আড়ালে থাকা শত্রুতা ভয়াবহ রূপ নেয়।
ওমর হাদি যদি বিস্তারিত লেখেন, তবে সেখানে হয়তো উঠে আসবে হাদির শেষ দিনগুলোর মানসিক অবস্থা, কাদের সাথে তার বিরোধ ছিল এবং কেন তাকে জীবন দিতে হলো।
কেন ওমর হাদির বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ?
১. প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্র: পরিবারের সদস্য হিসেবে হাদির সাথে শেষ সময়ে যা যা ঘটেছে, তার প্রথম তথ্যদাতা হিসেবে ওমর হাদির কথার গুরুত্ব অপরিসীম।
২. ইনকিলাব মঞ্চের স্বচ্ছতা: মঞ্চের ভেতরে যদি কোনো ঘাতক ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে, তবে তা খুঁজে বের করা সংগঠনের ভবিষ্যতের জন্যই মঙ্গলজনক।
৩. জনআকাঙ্ক্ষা: হাদির সমর্থকরা এবং সাধারণ মানুষ জানতে চায়, কেন একজন মেধাবী নেতৃত্বকে অকালে ঝরে যেতে হলো।
কিসের অপেক্ষায় দেশবাসী?
শরিফ ওমর হাদি যে সত্যের ডালি নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছেন, তা হয়তো ইনকিলাব মঞ্চের অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
কিন্তু একজন ভাইয়ের বিচার পাওয়ার আকুতি সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
আগামী কয়েক দিনে তার ফেসবুক দেয়াল থেকে কী কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা দেশ।
হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার কি তবে ঘরের কাছের মানুষদের বিরুদ্ধেই শুরু হবে? নাকি এটি কেবলই কোনো আবেগপ্রসূত পোস্ট? উত্তর মিলবে খুব শীঘ্রই।
