যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধের পর এবার অস্ট্রেলিয়া থেকেও ডিপোর্ট করা হচ্ছে মিজানুর রহমান আজহারীকে। ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ও উগ্রবাদের অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে তার ভিসা।
যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ধাক্কার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশের আলোচিত ও বিতর্কিত ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী। অস্ট্রেলিয়ার সরকার তাকে ‘উগ্র ও চরমপন্থী ইসলামি বক্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেশ থেকে বহিষ্কার বা ডিপোর্ট করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি মেইল’ এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
জানা গেছে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পবিত্র উৎসব ‘ইস্টার’ চলাকালীন অস্ট্রেলিয়ায় পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার কথা ছিল আজহারীর।
কিন্তু তার বিতর্কিত অতীত এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের রেকর্ড সামনে আসায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি ভিত্তিতে তার ভিসা বাতিল করেছে।
ভিসা বাতিলের নেপথ্যে: হিটলারের প্রশংসা ও ইহুদি বিদ্বেষ
অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিজানুর রহমান আজহারীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তার ইহুদিবিদ্বেষী অবস্থান।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ্যাডলফ হিটলারের চালানো ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা ‘হলোকাস্ট’কে ‘ঈশ্বরীয় শাস্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তার সেই ভাষণে ইহুদিদের অত্যন্ত অমানবিক ভাষায় বর্ণনা করা এবং সাধারণ মানুষকে তাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানোর ভিডিও ক্লিপগুলো অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর হাতে পৌঁছায়।
দেশটির আইন অনুযায়ী, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ায় এমন কোনো ব্যক্তিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হয় না।
সফরের মাঝপথে ডিপোর্টেশন: সিনেটে তোলপাড়
আজহারী ‘Legacy of Faith’ নামক একটি সিরিজের অংশ হিসেবে ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি এবং ক্যানবেরায় বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সফরের মাঝপথেই মঙ্গলবার তার ভিসা বাতিল করা হয়। বুধবার অস্ট্রেলিয়ার সিনেটে বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়েছে।
লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডুনিয়াম জানান, আজহারীর আগমন নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো আগে থেকেই সরকারকে সতর্ক করেছিল।
বিশেষ করে ‘অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ’সহ বেশ কিছু সংগঠন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের কাছে চিঠি পাঠিয়ে আজহারীর উগ্রবাদী সংশ্লিষ্টতা এবং বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
প্রতিবেদনে আজহারীকে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট একজন বক্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, বাংলাদেশেও তার প্রকাশ্য বক্তৃতার ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১ কোটি অনুসারী থাকা এই বক্তা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রবাসী মুসলিমদের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন।
তবে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার এই কঠোর অবস্থান তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কের ঝড়
আজহারীকে শুরুতে ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের প্রশাসন এখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিরোধী দলের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন ‘ঘৃণা প্রচারকারী’ ব্যক্তিকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই কীভাবে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো? তারা একে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সংহতি ও শান্তি বজায় রাখতে যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তির ভিসা বাতিলের আইনি অধিকার সরকারের রয়েছে।
আজহারী বর্তমানে পুলিশি নজরদারিতে ডিপোর্টেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইউরোপ ও আমেরিকায় আজহারীর ভবিষ্যৎ কী?
এর আগে ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যে আজহারীর প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
তখন ব্রিটিশ হোম অফিস জানিয়েছিল, তার উপস্থিতি দেশটির সামাজিক পরিবেশে উগ্রবাদ উস্কে দিতে পারে।
এখন অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্তের পর কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোও তার ওপর নজরদারি বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন ধর্মীয় বক্তার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ধরনের ‘চরমপন্থী’ তকমা পাওয়া অত্যন্ত সম্মানহানিকর।
এটি কেবল আজহারীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষী প্রচারকদের ভাবমূর্তিও সংকটে ফেলতে পারে।
বাক স্বাধীনতা বনাম ঘৃণা প্রচার
অস্ট্রেলিয়া থেকে মিজানুর রহমান আজহারীর বহিষ্কারের ঘটনাটি আবারো ‘বাকস্বাধীনতা’ এবং ‘ঘৃণা প্রচার’ (Hate Speech)-এর মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম সীমারেখাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ধর্মীয় আলোচনার আড়ালে যদি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়,
তবে আধুনিক পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো যে তা মেনে নেবে না—আজহারীর ঘটনাটি তারই একটি বড় প্রমাণ।
অস্ট্রেলিয়া থেকে ডিপোর্ট হওয়ার পর আজহারী এখন কোন দেশে আশ্রয় নেবেন বা বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে তার অনুসারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
