মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের জেরে গভীর জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে উঠে এল মজুদ সংকট ও জনজীবনের স্থবিরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধাবস্থা এবং বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ হওয়ার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার প্রথম এবং বড় শিকার হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটিতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেল ও গ্যাসের মজুদ শূন্যে নেমে আসতে পারে, যা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
টেলিগ্রাফের হুঁশিয়ারি: কেন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এশিয়ায় পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশ এবং এলএনজির (LNG) প্রায় ৯০ শতাংশই এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করে, যার একটি বিশাল অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের এই সময়ে বাংলাদেশ যেখানে ৩ লাখ ৩২ হাজার টন তেল ও ডিজেল আমদানি করেছিল, চলতি মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজার টনে।
অর্থাৎ, আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন সুতোর ওপর ঝুলছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির বিপজ্জনক তথ্য: হাতে আছে মাত্র ১৭ দিন!
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’র তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে তাদের কাছে মজুদ ছিল মাত্র ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল। বর্তমান চাহিদার নিরিখে এই মজুদ দিয়ে বড়জোর ১৭ থেকে ২১ দিন চলা সম্ভব। ডিজেল ও পেট্রলের ক্ষেত্রেও একই রকম উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকার বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ অনুমতি চেয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে কিছু সরবরাহ নিশ্চিত করলেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
ঢাকার রাজপথে হাহাকার: থমকে গেছে জনজীবন
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতির এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
রাজধানীর পেট্রল পাম্পগুলোতে এখন মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।
- গণপরিবহন সংকট: তেলের অভাবে রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা হাতেগোনা।
- ডেলিভারি সেক্টরে স্থবিরতা: ফুড ও ই-কমার্স ডেলিভারি কর্মীরা বাইকে তেল না পেয়ে অলস বসে থাকছেন।
- রেশনিং ব্যবস্থা: দেশজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অঘোষিত জ্বালানি রেশনিং চললেও সরকারের পরিকল্পনায় সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।
সরকারি ভাষ্য: সংকট না কি অতিরিক্ত চাহিদা?
ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার অবশ্য বড় কোনো সংকটের কথা মানতে নারাজ।
জাতীয় সংসদে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেছেন যে, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই।
তার মতে, গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বরং বেড়েছে।
তিনি বর্তমান অস্থিরতার জন্য ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনাকে দায়ী করেছেন।
মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, একেকজন মোটরসাইকেল চালক প্রয়োজনের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি তেল মজুদ করছেন বলেই পাম্পে জটলা তৈরি হচ্ছে।
তবে শিল্প খাতের গোপন সূত্রগুলো বলছে, কিছু অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেশী ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের চিত্র
জ্বালানির এই দাবদাহ কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। টেলিগ্রাফের তথ্যমতে:
ভারত: দিল্লির কাছে ৬০ দিনের মজুদ থাকলেও জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
নিজস্ব চাহিদার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে করা ডিজেল সরবরাহ চুক্তিতেও দিল্লি কিছুটা ধীরগতি দেখাচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের কথা ভাবছে দেশটি।
ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম: ফিলিপাইনে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা হয়েছে। ভিয়েতনামের হাতে আছে মাত্র তিন সপ্তাহের মজুদ।
জাপান ও মিয়ানমার: জাপান তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। মিয়ানমারে সামরিক জান্তা কঠোর রেশনিং শুরু করেছে।
কূটনৈতিক সমীকরণ ও বেইজিংয়ের ‘কৌশল’
এই সংকটের সুযোগ নিচ্ছে চীন। অনেক দেশ নিরুপায় হয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির গোপন আলোচনায় বসছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন এই বিশ্বব্যাপী সংকটকে তার কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার করতে পারে।
এমনকি যুক্তরাজ্যও যদি দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না করে, তবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লন্ডনের রাজপথেও জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে বলে টেলিগ্রাফ সতর্ক করেছে।
অনিশ্চয়তার পথে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী ২০ দিনের মধ্যে নতুন বড় কোনো চালান দেশে আনা।
যদি তা সম্ভব না হয়, তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প—সবকিছুই বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
যদিও নতুন চালানের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে যুদ্ধের কারণে তেলের আকাশচুম্বী দাম বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
সাধারণ মানুষ এখন কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করছেন, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন দ্রুত নিভে যায় এবং হরমুজ প্রণালির পথ আবার নিরাপদ হয়।
