নকল ওষুধে ২৮৯ মৃত্যু ও টিকা সংকটে ৩৮ শিশুর প্রাণহানি। পিনাকী ভট্টাচার্য এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব জনতা।
প্রফেসর ডঃ আরিফ খান, সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি, লন্ডন: | ১ এপ্রিল, ২০২৬:
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে গত দুই দশকে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ কিছু ট্র্যাজেডির নেপথ্য কারিগরদের বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের ‘নকল কালাজ্বর ওষুধ’ কেলেঙ্কারি এবং সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ‘অত্যাবশ্যকীয় টিকা’ সংকটের ফলে কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় পিনাকী ভট্টাচার্য এবং বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবার এবং সচেতন নাগরিকদের মতে, মানুষের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
পিনাকী ভট্টাচার্য ও মিল্টেফস কেলেঙ্কারি: ২৮৯ প্রাণের হাহাকার
ফরাসি প্রবাসী বিতর্কিত ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্যের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
২০০৮ সালে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালীন তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কালাজ্বরের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘মিল্টেফস’ (Miltefosine) নামক একটি ওষুধ বাজারজাত করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, উক্ত ওষুধটি ছিল সম্পূর্ণ কার্যকরহীন বা ‘নকল’।
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তথ্যমতে, এই ভুয়া ওষুধ খেয়ে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে অকালে প্রাণ হারান প্রায় ২৮৯ জন মরণব্যাধি কালাজ্বরের রোগী। এছাড়া হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এই বিশাল প্রাণহানির পর আইনি জটিলতা ও গ্রেপ্তার এড়াতে পিনাকী ভট্টাচার্য অবৈধ পথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন।
বর্তমানে তিনি প্রবাসে বসে অনলাইন প্রচারণা চালালেও দেশে থাকা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখনো তার বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
ইউনূস সরকারের টিকা সংকট: ৩৮ শিশুর মৃত্যুতে স্তব্ধ দেশ
অন্যদিকে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের বিরুদ্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
গত দুই বছরে দেশের অত্যাবশ্যকীয় হাম, পোলিও এবং মাতৃত্বকালীন টিকা আমদানিতে ভয়াবহ ধীরগতি এবং গাফিলতি লক্ষ্য করা গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, টিকা সংকটের কারণে দেশজুড়ে ইতিমধ্যে ৩৮ জন নিষ্পাপ শিশু মারা গেছে, যা আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এক নজিরবিহীন কলঙ্ক।
৪১ হাজার ৪০১ কোটি টাকার বিশাল স্বাস্থ্য বাজেট থাকা সত্ত্বেও কেন জীবনরক্ষাকারী টিকা সময়মতো পৌঁছাল না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের দাবি, এই অর্থ লুটপাট এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।
প্রশাসনিক গাফিলতি ও ৪১ হাজার কোটির বাজেট রহস্য
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নূর জাহান বেগমের মেয়াদে টিকা সংগ্রহের আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াগুলোকে পাশ কাটিয়ে অদক্ষ পদ্ধতি অনুসরণের ফলেই এই বিপর্যয়।
৪১ হাজার ৪০১ কোটি টাকার বাজেটের একটি বড় অংশ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া কেবল প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং এটি একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।
বিচারের দাবিতে উত্তাল রাজপথ ও সোশ্যাল মিডিয়া
পিনাকী ভট্টাচার্য এবং নূর জাহান বেগম—উভয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় উঠেছে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, একজনের অপরাধ ২০০৮ সালের জাল ওষুধ তৈরির মাধ্যমে ২৮৯ জন প্রাপ্তবয়স্কের প্রাণ কেড়ে নেওয়া,
আর অন্যজনের অপরাধ দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে ৩৮ শিশুর মৃত্যু ত্বরান্বিত করা।
ভুক্তভোগী একজন অভিভাবক বলেন, “আমার সন্তান টিকা না পেয়ে মারা গেল, আর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বড় বড় বাজেট দেখিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। আমরা এই খুনের বিচার চাই।”
পিনাকী ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
আইনি ভাষ্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
আইনজীবীদের মতে, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বা অবহেলার কারণে মৃত্যু ঘটানো দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নকল ওষুধ তৈরি এবং সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা—উভয় ক্ষেত্রেই যদি অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব দিয়েছেন অনেকে।
নিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রত্যাশা
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কেবল একটি স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চায়।
পিনাকী ভট্টাচার্যের মতো ওষুধের কারিগর বা নূর জাহান বেগমের মতো নীতি-নির্ধারকদের ভুলের মাশুল কেন সাধারণ মানুষকে জীবন দিয়ে দিতে হবে?
২৮৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৩৮ শিশুর মৃত্যুর প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়ার সময় এসেছে।
জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থদের আইনের আওতায় আনাই হবে আগামীর সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশের প্রথম ধাপ।
