২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে ড. ইউনূস সরকারের সই করা গোপন এনডিএ (NDA) চুক্তির নেপথ্য ফাঁস। জ্বালানি আমদানিতে মার্কিন অনুমতি ও অস্ত্র ক্রয়ে কঠোর শর্তের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রফেসর ডঃ আরিফ খান, সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি, লন্ডন: লন্ডন; ১ এপ্রিল, ২০২৬;
বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সমীকরণগুলোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাইডেন প্রশাসনের আরোপিত রুশ জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা যখন নবনির্বাচিত ট্রাম্প প্রশাসন তুলে নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—শেখ হাসিনা সরকার যেখানে রাশিয়ার চাপের মুখেও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে পেরেছিলেন, সেখানে বর্তমান বা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনকে কেন প্রতিটি পদক্ষেপে ওয়াশিংটনের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগের এক রুদ্ধদ্বার অধ্যায়।
অভিযোগ উঠেছে, ডিপ স্টেটের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সরকার আমেরিকার সাথে এমন একটি অত্যন্ত গোপনীয় ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ (NDA) সই করেছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গোপন এনডিএ (NDA): জনসম্মুখে কেন প্রকাশ নিষিদ্ধ?
এনডিএ বা গোপনীয়তা চুক্তির মূল শর্তই হলো—এর কোনো ধারা গণমাধ্যম, কোনো আন্তর্জাতিক ফোরাম বা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা যাবে না।
এই চুক্তির আড়ালে এমন কিছু শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে, যাকে বিশ্লেষকরা ‘আধুনিক গোলামির শিকল’ বলে অভিহিত করছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের গোলামি থেকে বাঁচার দোহাই দিয়ে কি তবে সুকৌশলে বাংলাদেশকে অন্য কোনো পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে সমর্পণ করা হলো?
জ্বালানি আমদানিতে ‘আমেরিকান ভেটো’
চুক্তির অন্যতম ভয়ংকর একটি দিক হলো জ্বালানি তেল আমদানি।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, বাংলাদেশ রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে তেল কিনতে গেলে আমেরিকার অনুমতি চাইছে।
কিন্তু কেন এই অনুমতির প্রয়োজন পড়ছে, তার উত্তর ছিল এই গোপন চুক্তিতে। এনডিএ-র শর্তানুযায়ী:
- ভারত ছাড়া অন্য যেকোনো দেশ থেকে জ্বালানি তেল কিনতে হলে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন প্রশাসনের লিখিত অনুমতি নিতে হবে।
- রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎসগুলো ব্যবহারের পথ এর ফলে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এতে প্রশ্ন জাগে—তবে কি ভারতের ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর বদলে আমরা এমন এক ব্যবস্থার দিকে গেলাম যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাবিকাঠি অন্য মহাদেশের হাতে?
প্রতিরক্ষা খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ: প্রযুক্তি ও অস্ত্রের বাজার বন্দি
চুক্তির দ্বিতীয় মারাত্মক অংশটি হলো প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাত।
বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম, বিমান এবং উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
- এখন থেকে বাংলাদেশ চাইলেও অন্য কোনো দেশ (যেমন চীন বা তুরস্ক) থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে পারবে না।
- আমেরিকা কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ বা মূল্যে শুধুমাত্র তাদের কাছ থেকেই এসব ইকুইপমেন্ট কিনতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে।
এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরনির্ভরশীলতা তৈরির এক সুনিপুণ ছক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৩ শতাংশের ধোঁকাবাজি ও ৩০ শতাংশের মুনাফা
কেন বাংলাদেশ সরকার এই আত্মঘাতী চুক্তিতে সই করল?
বিশ্লেষকরা এর পেছনে দুটি কারণ দেখছেন। প্রথমত, অভিযোগ রয়েছে যে টেবিলের দুই পাশেই ছিল ‘ডিপ স্টেট’ বা মার্কিন স্বার্থের প্রতিনিধিরা।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে ৩ শতাংশ ট্যারিফ কমিয়ে দেওয়ার একটি লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তবে এই ৩ শতাংশ ছাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় অংকের ধোঁকাবাজি। একদিকে ৩ শতাংশ ট্যারিফ কমানোর দোহাই দিয়ে অন্যদিকে আমেরিকান পণ্য চড়া দামে আমদানি করতে বাধ্য করিয়ে তারা ৩০ শতাংশেরও বেশি মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার পথ সুগম করেছে।
অর্থাৎ, ত্যাগের চেয়ে লাভের পাল্লা ভারি হয়েছে বিদেশের।
১৫ বছরের আইনি বাধ্যবাধকতা: পরবর্তী সরকারের হাত-পা কি বাঁধা?
সবচেয়ে শঙ্কার তথ্য হলো, এই চুক্তিতে এমন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে যার ফলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো নির্বাচিত সরকার চাইলেই এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে না। এটি এমন এক দীর্ঘমেয়াদী আইনি ফাঁদ, যা থেকে মুক্তির পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ।
বলা হচ্ছে, এই চুক্তিতে আরও এমন কিছু গোপন শর্ত আছে যা এখনো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
দিল্লি না ঢাকা—না কি ওয়াশিংটন?
তৌহিদী জনতা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ‘দিল্লি না ঢাকা’ নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, এই এনডিএ চুক্তি প্রকাশের পর তা নতুন মোড় নিয়েছে।
সার্বভৌমত্বের অর্থ যদি হয় নিজের ইচ্ছামতো জ্বালানি ও অস্ত্র কেনা, তবে সেই অধিকারে এখন বড় অন্তরায় এই গোপন চুক্তি।
দেশ কি তবে সত্যিই স্বাধীন পথে হাঁটছে, নাকি পর্দার আড়ালে নতুন কোনো মাস্টারপ্ল্যানের দাবার ঘুঁটি হচ্ছে বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
