শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি আপত্তি। লন্ডনভিত্তিক কিংসলে ন্যাপলি এলএলপি-র চিঠিতে বিচার প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ দাবি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বিচার প্রক্রিয়া এখন আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের মুখে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং পুরো বিচারিক কার্যক্রমকে ‘সম্পূর্ণ অবৈধ’ ও ‘আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী’ বলে দাবি করেছে লন্ডনের খ্যাতনামা আইন প্রতিষ্ঠান কিংসলে ন্যাপলি এলএলপি (Kingsley Napley LLP)। শেখ হাসিনার পক্ষে পাঠানো এক বিস্তারিত আইনি চিঠিতে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর সব মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক এই ল ফার্মটি দাবি করেছে, যে প্রক্রিয়ায় এই বিচার সম্পন্ন হয়েছে তা কোনোভাবেই বৈশ্বিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের সংজ্ঞায় পড়ে না।
অনুপস্থিতিতে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড: আইনের গুরুতর লঙ্ঘন?
কিংসলে ন্যাপলির চিঠিতে সবচেয়ে বড় আপত্তি তোলা হয়েছে ‘ইন অ্যাবসেন্টিনিয়া’ (In Absentia) বা আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার নিয়ে।
আন্তর্জাতিক আইনে অত্যন্ত বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া অনুপস্থিতিতে বিচার এবং বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান নেই। আইনজীবীরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে এই মামলার অভিযোগ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি এবং তাকে তার পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের ন্যূনতম সুযোগও দেওয়া হয়নি। আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করে ফাঁসির রায় ঘোষণা করাকে তারা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির (ICCPR) চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
বিচারক প্যানেল ও প্রসিকিউশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
আইনি চিঠিতে ট্রাইব্যুনালের গঠনতন্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরপেক্ষতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
এতে বলা হয়:
- রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা: আইসিটির নবনিযুক্ত বিচারকদের রাজনৈতিক ঝোঁক এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতার অভাব বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
- পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য: বিচার চলাকালীন সময়ে বিচারকদের পক্ষ থেকে আসা বিভিন্ন মন্তব্য নিরপেক্ষ বিচারকের আচরণের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
- প্রসিকিউশনের ভূমিকা: প্রধান প্রসিকিউটরের রাজনৈতিক অতীত এবং বর্তমান বিরোধী শিবিরের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এখতিয়ার বহির্ভূত বিচার: ১৯৭৩ বনাম ২০২৪
কিংসলে ন্যাপলি তাদের চিঠিতে আইসিটির আইনি এখতিয়ার (Jurisdiction) নিয়ে একটি মৌলিক আইনি পয়েন্ট তুলে ধরেছে।
ট্রাইব্যুনালটি মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আইনজীবীদের দাবি, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনাগুলোকে এই আইনের আওতায় আনা এবং পেছনের তারিখ থেকে (Retroactive) আইন সংশোধন করে প্রয়োগ করা আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতির পরিপন্থী।
তারা বলছেন, এই ট্রাইব্যুনালের বর্তমান মামলার বিচার করার কোনো বৈধ আইনি ম্যান্ডেট নেই।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য’
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল তারা একা নন, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাও এই বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে শুরু থেকেই সন্দিহান ছিল।
কিংসলে ন্যাপলির মতে, এই পুরো বিচারিক নাটকটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ন্যায্যতার মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় এই রায় কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বলে তারা সতর্ক করেছেন।
কিংসলে ন্যাপলির ৪ দফা দাবি ও আলটিমেটাম
বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো এই চিঠিতে চারটি প্রধান দাবি পেশ করা হয়েছে:
- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
- ভবিষ্যতে কোনো অবস্থাতেই এই দণ্ড কার্যকর না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
- যদি বিচার করতেই হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড মেনে পরিচালনা করতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
লন্ডনের এই আইন প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক জবাব প্রত্যাশা করেছে।
জবাব সন্তোষজনক না হলে তারা বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত ও বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে নিয়ে যাওয়ার সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছে।
সংকটে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আইনের শাসন নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই প্রক্রিয়া যেন প্রশ্নাতীত হয় তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিংসলে ন্যাপলির এই চিঠি কেবল একটি আইনি নোটিশ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক আয়নায় দেখার একটি সুযোগও তৈরি করেছে।
এখন দেখার বিষয়, ঢাকা থেকে এই চিঠির কী জবাব দেওয়া হয়।
