আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব ও হার্ডড্রাইভ বদলের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস। প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও আসামি ছাড় দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্দরে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও তথ্যপ্রমাণ ধ্বংসের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রসিকিউশন কার্যালয় থেকে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করার জন্য স্বয়ং হার্ডড্রাইভ বদলে ফেলার প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, গায়েব হওয়া সেই ভিডিও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বুধবার (১ এপ্রিল) এক জরুরি ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেন।
কী ঘটেছিল ১৩ অক্টোবর? টাকার ব্যাগের রহস্য
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ১৩ অক্টোবর। অভিযোগ ওঠে, আশুলিয়ায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও ৬ জনের লাশ পোড়ানো মামলার অন্যতম আসামি আফজালুলের পরিবারের এক সদস্য টাকার ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিমের কক্ষে প্রবেশ করেন। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি তোলেন খোদ অন্য এক প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ।
সেই দিন আসলে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত হতে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে যান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা।
কিন্তু তিনি দেখতে পান, রহস্যজনকভাবে ওই নির্দিষ্ট দিনের কোনো ভিডিও ফুটেজ হার্ডড্রাইভে নেই।
তানভীর জোহা’র বয়ান: হার্ডড্রাইভ রিপ্লেস করার প্রমাণ
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা জানান, প্রাথমিক তদন্তে সিসলগ (Syslog) এবং রেজিস্ট্রার খাতায় অসংগতি পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, “আমরা সিসলগ পরীক্ষা করে দেখেছি যে, সেখানে থাকা অরিজিনাল হার্ডড্রাইভগুলো সরিয়ে পুরনো ও নতুন কিছু হার্ডড্রাইভ দিয়ে ‘রিপ্লেস’ করা হয়েছে। অর্থাৎ, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ওই দিনের প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছে।”
বিষয়টি বর্তমানে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির অধীনে তদন্তাধীন রয়েছে এবং দ্রুতই মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ জমা দেওয়া হবে।
তাজুল-শিশির মনির সিন্ডিকেট: টাকার বিনিময়ে দায়মুক্তির অভিযোগ
প্রসিকিউশন টিমের সদস্য অ্যাডভোকেট বিএম সুলতান মাহমুদ এই ঘটনার পেছনে এক বিশাল ‘সিন্ডিকেট’ জড়িত থাকার দাবি করেছেন।
তার অভিযোগের আঙুল সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনিরের দিকে।
সুলতান মাহমুদের বিস্ফোরক অভিযোগগুলো হলো:
রাজসাক্ষীর নাটক: সাবেক আইজিপি মামুনকে রাজসাক্ষী বানিয়ে দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য ধানমন্ডির তদন্ত সংস্থায় বসে ছক কষা হয়েছে। সেখানে শিশির মনিরের উপস্থিতিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
টাকা কামানোর হাতিয়ার: চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা উপার্জনের মাধ্যমে পরিণত করা হয়েছে। দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে নিরাপদে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
আফজালের খালাস: আশুলিয়ার মামলার আসামি আফজালের স্ত্রী সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর তামিমের রুমে ঢুকেছিলেন।
বিষয়টি তাজুল ইসলামকে জানানো হলেও তিনি ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অভিযোগকারীদের বকাঝকা করেন।
পরবর্তীতে সেই আফজালকেই রহস্যজনকভাবে রাজসাক্ষী করে খালাস দেওয়া হয়।
চেয়ারম্যানের ফোন হ্যাক: নেপথ্যে কারা?
ব্রিফিংয়ে তানভীর জোহা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মূর্তাজা মজুমদারের ব্যক্তিগত ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছিল।
যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফোন ও অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং হ্যাকারের আইপি অ্যাড্রেস শনাক্ত করেছে, তবে এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
গত ১৮ মার্চ এই হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে শাহবাগ থানায় একটি জিডিও করা হয়েছে।
বিচারের নামে কি প্রহসন চলছে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় যখন খোদ প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ এবং সিসিটিভি ফুটেজ গায়েবের অভিযোগ ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
প্রশ্ন উঠেছে—যাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দায়িত্ব, তারা কি নিজেরাই অপরাধী সিন্ডিকেটের অংশ হয়ে পড়েছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করা বা হার্ডড্রাইভ বদলে ফেলা সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
এর মাধ্যমে বড় কোনো দুর্নীতির প্রমাণ লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে কি না, তা উচ্চতর তদন্তের দাবি রাখে।
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির দিকে সবার নজর
বর্তমানে পুরো বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির অধীনে রয়েছে।
তানভীর জোহা জানিয়েছেন, তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় তিনি অগ্রিম কোনো মন্তব্য করবেন না।
তবে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সচেতন নাগরিকদের দাবি—চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে বসে যারা অপরাধীদের পালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে এবং প্রমাণ নষ্ট করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক।
বিচারের বাণী কি নিভৃতে কাঁদবে, নাকি এই সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
