সরবরাহে টান ও জ্বালানি সংকটে অস্থির মুরগির বাজার। সোনালি মুরগি ৪২০ ও দেশি মুরগি ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের পাতে আমিষ জোগানোই এখন দায়।
ঈদুল ফিতরের পরবর্তী সময়ে সাধারণত বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমে আসার কথা থাকলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সোনালি ও দেশি মুরগির দাম আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাজারে সোনালি মুরগি ৪২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার ‘রেকর্ড’ মূল্যবৃদ্ধি।
মাংসের বাজার যেন ‘বিলাসিতা’: ৮২০ ছুঁয়েছে গরুর মাংস
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, কেবল মুরগি নয়, গরু ও খাসির মাংসের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এক সপ্তাহ আগে ৭৫০ টাকায় মিললেও এখন প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮২০ টাকায়। খাসির মাংসের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দামও আগের তুলনায় ৫০-৬০ টাকা বেড়ে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ এতটাই কমেছে যে আগে যেখানে দিনে কয়েক হাজার মুরগি আসত, এখন তা অর্ধেকের নিচে নেমেছে। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
খামারিদের দাবি: উৎপাদন ঠিক থাকলেও বাধা ‘পরিবহন’
মুরগির বাজারে এই অস্থিরতার পেছনে খুচরা বিক্রেতা এবং খামারিদের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। খামারিদের দাবি, মুরগির উৎপাদন পর্যায়ে বড় কোনো ঘাটতি নেই। মূল সমস্যা তৈরি হচ্ছে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায়। সময়মতো গাড়ি না পাওয়া এবং অতিরিক্ত ভাড়া গুনে বাজারে পণ্য পৌঁছাতে গিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার জানান, ক্ষুদ্র খামারিরা দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না বাড়লেও দেশি ফিড কোম্পানিগুলো যুদ্ধের অজুহাতে খাদ্যের দাম কেজিতে আড়াই টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
ফিডের দাম ও আমদানিনির্ভরতা: আগামীর শঙ্কা
পোলট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ফিড তৈরির কাঁচামাল আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মতে, পরিস্থিতি উন্নতি না হলে ফিডের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এতে ভবিষ্যতে মুরগির মাংসের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রবল।
মাছ ও সবজির বাজারও উত্তপ্ত
আমিষের বিকল্প হিসেবে মাছের বাজারে গিয়েও স্বস্তি পাচ্ছেন না ভোক্তারা। রুই ও কাতলা মাছ কেজি প্রতি ৩০০ থেকে ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া টেংরা ৭৫০ এবং চিংড়ি ১ হাজার ২০০ টাকায় ঠেকেছে। সবজির বাজারেও অধিকাংশ পণ্য ৮০ থেকে ১২০ টাকার ঘরে।
- কাঁচা মরিচ: ১২০ টাকা (প্রতি কেজি)
- করলা ও ঝিঙা: ১২০ টাকা
- পটল ও বেগুন: ৮০ টাকা
- লাউ ও কুমড়া: ৬০ টাকা (কিছুটা কম)
ভোক্তার হাহাকার: ‘অর্ধেক বাজারেও কুলাচ্ছে না’
বাজারে আসা ক্রেতাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, “আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে আসতাম, এখন সেই টাকায় অর্ধেক ব্যাগও ভরে না।
মাছ-মাংস খাওয়া কমিয়ে সবজির দিকে ঝুঁকছিলাম, সেখানেও একই অবস্থা।”
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন আমিষের তালিকায় কাঁটছাঁট করে ডাল-ভর্তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত: নজরদারি না কি সদিচ্ছার অভাব?
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন।
তার মতে, বাজারে যেসব পণ্য এখন বিক্রি হচ্ছে তার বেশির ভাগই কয়েক মাস আগে আমদানি করা।
জ্বালানি বা যুদ্ধের দোহাই দিয়ে হুট করে দাম বাড়ানো স্রেফ সিন্ডিকেটের কারসাজি। তিনি সরকারের প্রতি মজুদ ও বণ্টন ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান।
প্রয়োজন জরুরি পদক্ষেপ
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও স্থানীয় বাজারের অব্যবস্থাপনা এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা পকেট ভারি করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়বে।
রমজান পরবর্তী এই সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ও জ্বালানি সমস্যার সমাধানে সরকারকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
