মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় দেশে ভোজ্যতেলের বাজারে নতুন সংকট। এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ১০ টাকা। খুচরা বাজারে সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ।
ঈদুল ফিতরের আমেজ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে আঘাত হেনেছে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটার প্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খোলা পাম তেলের দামও। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাতে মিলগেট থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত এই দামের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
খুচরা বাজারের চিত্র: ২০০ ছুঁইছুঁই সয়াবিন
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট এবং তেজকুনীপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেল এখন প্রতি লিটার ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ মাত্র সাত দিন আগেও এই তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে সাধারণ মানুষকে লিটার প্রতি অতিরিক্ত ১০ টাকা গুনতে হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে পাম তেলের বাজারেও। গত সপ্তাহে ১৭৫ টাকার আশেপাশে থাকা পাম তেল বর্তমানে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, মিল পর্যায়ে দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির ফলে পাইকারি বাজারেও প্রভাব পড়েছে।
সরকারি দামের চেয়ে ২০-২৫ টাকা বেশি!
সবশেষ গত ডিসেম্বর মাসে সরকার ও ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো আলোচনার ভিত্তিতে খোলা সয়াবিন ১৭৬ টাকা এবং পাম তেল ১৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে এখন ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম ৬ শতাংশ বেড়েছে।
গত বছরের তুলনায় এখন সয়াবিনের দাম ১৮ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম ১১ শতাংশ বেশি।
সরবরাহ সংকট ও ছোট বোতলের আকাল
বাজারে গত দেড় মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের তীব্র সরবরাহ সংকট চলছে।
বিশেষ করে এক বা দুই লিটারের বোতল অধিকাংশ দোকানেই মিলছে না।
খুচরা বিক্রেতারা ৫ লিটারের বড় বোতল কিনতে ক্রেতাদের বাধ্য করছেন।
তেজকুনীপাড়ার বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, “বাসায় আগে বোতলের তেল খেতাম। কিন্তু এখন ছোট বোতল পাওয়াই যায় না।
বাধ্য হয়ে খোলা তেল কেনা শুরু করেছি। এখন দেখছি খোলা তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবন চালানো এখন দায় হয়ে পড়েছে।”
কেন বাড়ছে দাম? কোম্পানিগুলোর যুক্তি
ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটা বেড়েছে।
গত ২৫ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাম সমন্বয়ের জন্য চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দাম বাড়ানোর অনুমতি না দিলেও ডিলার পর্যায়ে কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া দেশে বর্তমানে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে তেলের লরি বা ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বাড়তি পরিবহন খরচও শেষ পর্যন্ত ক্রেতার পকেট থেকেই যাচ্ছে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস
চাল, মুরগি এবং সবজির দাম এমনিতেই চড়া, তার ওপর তেলের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের সংসার চালানোর হিসাব ওলটপালট করে দিচ্ছে।
টিসিবির ট্রাক সেলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইনই বলে দিচ্ছে বাজারের অস্থিরতা কতটা চরমে পৌঁছেছে।
অনেক খুচরা বিক্রেতা আবার সরবরাহ সংকটের দোহাই দিয়ে গায়ে লেখা সর্বোচ্চ মূল্যের (MRP) চেয়েও বেশি দাম রাখছেন বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন।
প্রয়োজন কঠোর নজরদারি
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানের পরেও বাজারের এই অরাজকতা থামছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের দোহাই দিয়ে বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা তেলের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।
পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে না পারলে খোলা তেলের ওপর চাপ বাড়বে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটি নিতেই থাকবে।
সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
