২৫০ বিলিয়ন ডলার পাচারের হিসাব কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? অধ্যাপক ড. আরিফ খান গাণিতিক নিরিখে বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেট ও অর্থ পাচারের সমীকরণ।
লিখেছেন: অধ্যাপক ড. আরিফ খান
বিশেষ কলাম | ৬ এপ্রিল, ২০২৬
কাকাতুয়া বা ময়না-টিয়া মানুষের মতো শব্দ উচ্চারণ করতে পারে, কিন্তু তারা সেই শব্দের অর্থ বোঝে না। তাদের বুলি কেবলই অনুকরণ। আমাদের সমাজের অনেক বুদ্ধিজীবী যখন পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলেন, তখন অনেক সময় মনে হয় তারা শব্দের অর্থ না বুঝেই তোতাপাখির মতো কথা বলছেন। গণিত না জানলে উপলব্ধিটা আসলে শিশুর মতোই থেকে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে—২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত সরকার নাকি ২৫০ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। হিসাবটি শুনতে বেশ চমকপ্রদ, কিন্তু গণিতের কষ্টিপাথরে এটি যাচাই করা কি জরুরি নয়?
বাজেট ও পাচারের উৎস: সাধারণ মানুষের হিসাব
টাকা আকাশ থেকে পড়ে না। জনগণ ট্যাক্স দেয়, সেই টাকা দিয়ে দেশের বাজেট হয়। বাজেটের দুটি প্রধান অংশ থাকে:
১. অপারেটিং বাজেট (প্রায় ৬০%): যা মূলত সরকার চালানোর খরচ (বেতন, পেনশন, ওষুধ, ঋণের সুদ ইত্যাদি)। এখান থেকে টাকা চুরি করা প্রায় অসম্ভব।
২. উন্নয়ন বাজেট (ADP): যেখান থেকে সেতু, রাস্তা বা বিদ্যুৎ প্রকল্প হয়। দুর্নীতির অভিযোগ মূলত এখানেই ওঠে।
২৪৬ বনাম ২৫০: এক গাণিতিক ধাঁধা
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট উন্নয়ন বাজেটের (ADP) দিকে তাকালে এক বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে আসে। বিগত ১৬ বছরের মোট উন্নয়ন বাজেটের যোগফল হলো প্রায় ২৪৫.৭৬ বিলিয়ন ডলার।
নিচে বছরভিত্তিক একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
- ২০০৯-২০১৪: প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার
- ২০১৪-২০১৯: প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার
- ২০১৯-২০২৪: প্রায় ১৩১ বিলিয়ন ডলার
- মোট উন্নয়ন বাজেট: প্রায় ২৪৬ বিলিয়ন ডলার
এখন প্রশ্ন হলো, যদি ১৬ বছরে দেশের সব রাস্তা, ঘাট, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দই থাকে ২৪৬ বিলিয়ন ডলার, তবে পাচার ২৫০ বিলিয়ন ডলার হলো কীভাবে? এর অর্থ কি এই যে, ১৬ বছরে দেশে একটি ইটের কাজও হয়নি এবং সরকার যা বরাদ্দ ছিল তার চেয়েও বেশি চুরি করেছে?
| Fiscal Year | Development Budget (Approx. USD) |
| 2009–2014 | ~$35 Billion |
| 2014–2019 | ~$80 Billion |
| 2019–2024 | ~$131 Billion |
| Total | ~$246 Billion |
মেগা প্রজেক্ট ও বৈশ্বিক তুলনা: রূপপুর কি আসলেই লুটপাট?
অনেকে বলেন প্রজেক্টের খরচ বাড়িয়ে চুরি করা হয়েছে। আমরা যদি দেশের বৃহত্তম প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের কথা ধরি, যার বাজেট প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়ার একই কোম্পানি তুরস্ক, মিসর ও হাঙ্গেরিতে একই ধরনের রিয়েক্টর বসাচ্ছে।
এক নজরে আন্তর্জাতিক তুলনা:
- রূপপুর (বাংলাদেশ): ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার
- এল দাবার (মিসর): ১৪.৩ – ১৫.৬ বিলিয়ন ডলার
- পাকস ২ (হাঙ্গেরি): ১২.৫ বিলিয়ন ইউরো
- আক্কুয়ু (তুরস্ক): ১০ বিলিয়ন ডলার
এই তথ্য প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের প্রকল্পের খরচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বাইরে নয়। যদি পুরো ১২ বিলিয়ন ডলারই পাচার করা হতো, তবে আজ রূপপুরে বিশাল অবকাঠামো দৃশ্যমান থাকত না।
গণিতই হোক বিবেকের চোখ
রাস্তার ট্রাকের পেছনে লেখা থাকে, “আপনার সন্তানকে স্কুলে পাঠান।” কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমার মনে হয় লেখা উচিত— “আপনার সন্তানকে গণিত শেখান।”
গণিত জানলে সে ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক বা বিশ্লেষক হয়ে প্রশ্ন করতে পারবে যে, যে হাড়িতে ভাত আছে ২৪৬ দানা, সেখান থেকে ২৫০ দানা চুরি করা কীভাবে সম্ভব? তোতাপাখির মতো অন্যের শেখানো বুলি আউড়ে নয়, বরং প্রকৃত গাণিতিক উপলব্ধি দিয়ে আমাদের সত্যকে চিনতে হবে।
দুর্নীতি অবশ্যই নিন্দনীয় এবং তার বিচার হওয়া উচিত, কিন্তু সেই অভিযোগের ভিত্তি হওয়া উচিত যুক্তি ও তথ্যনির্ভর।
