শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী শাহরিয়ার সোহাগের বিস্ফোরক অভিযোগ। সাক্ষ্য বিকৃত করার চেষ্টা ও ট্রাইব্যুনালে ডাক না পাওয়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী ও সাঈদের ঘনিষ্ঠ সহচর শাহরিয়ার সোহাগ দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার প্রকৃত বক্তব্য বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তিনি প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হচ্ছে না।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ক্যাফেটেরিয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেন। শাহরিয়ার সোহাগের এই অভিযোগের পর ঐতিহাসিক এই মামলার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাঈদের ছায়াসঙ্গী সোহাগ: যা ঘটেছিল অন্তরালে
সংবাদ সম্মেলনে শাহরিয়ার সোহাগ নিজেকে শহীদ আবু সাঈদের শুরু থেকে শেষ মুহূর্তের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, “আন্দোলনের সূচনা থেকে পুলিশের গুলিতে সাঈদের লুটিয়ে পড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তার পাশেই ছিলাম। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা আমার নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তদন্ত প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করছি।”
সোহাগ জানান, ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলীর দায়ের করা মামলায় (জি/আর নং-১১১/২০২৪) তিনি শুরু থেকেই তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই-কে সহযোগিতা করেছেন। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তরের পর থেকেই পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে
সাক্ষ্যের খসড়ায় ‘বক্তব্য বিকৃতি’র বিস্ফোরক তথ্য
শাহরিয়ার সোহাগের অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর একটি বিশেষ ঘটনা।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট তাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হলে তিনি সেখানে একটি ‘সাক্ষ্যের খসড়া’ দেখতে পান।
সোহাগ বলেন, “সেই খসড়াটি পড়ে আমি হতভম্ব হয়ে যাই।
সেখানে আমার নামে যা লেখা ছিল, তা আমার প্রকৃত বক্তব্য ও অবস্থানের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থাৎ, আমি যা দেখেছি বা বলেছি, তা সেখানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
আমি তাৎক্ষণিকভাবে সেই বিকৃত খসড়ার ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিতে আপত্তি জানাই।”
কেন থমকে আছে সাক্ষ্য গ্রহণ?
আপত্তি জানানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সোহাগের সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে এবং তাকে পুনরায় ডাকার আশ্বাস দেয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ট্রাইব্যুনাল থেকে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
সোহাগের দাবি, প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাদ দিয়ে মামলার রায় বা বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে তা ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করবে।
সোহাগ স্পষ্ট করে বলেন, “আমি এখনো সাক্ষ্য দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিন্তু আমাকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
প্রত্যক্ষদর্শী ও মূল সাক্ষীর সাক্ষ্য না নেওয়া হলে পুরো বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং শহীদের আত্মা শান্তি পাবে না।”
ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ
আবু সাঈদ হত্যা মামলাটি বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে একটি আবেগের জায়গা।
এই মামলার বিচার নিয়ে কোনো ধরণের ‘গোপন সমঝোতা’ বা ‘তদন্তে গাফিলতি’র অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
শাহরিয়ার সোহাগের আশঙ্কা, তার মতো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে পাশ কাটিয়ে বিচার সম্পন্ন হলে সকল পক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা এখন বড় প্রশ্ন
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্র সারা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণে কেন এমন লুকোচুরি বা অনীহা—তার জবাব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।
শাহরিয়ার সোহাগের এই অভিযোগ কেবল একটি ব্যক্তিগত অসন্তোষ নয়, বরং এটি পুরো বিচারিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর একটি বড় দাগ।
শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে প্রতিটি প্রত্যক্ষদর্শীর নির্ভীক সাক্ষ্য গ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
