করাচিতে কারিগরি কেন্দ্রের আড়ালে লস্কর জঙ্গি নাদিমের নাশকতামূলক প্রশিক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চলছে ভর্তি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৮ এপ্রিল, ২০২৬:
পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে এক ভয়াবহ ‘ছায়া প্রকল্পের’ তথ্য সামনে এসেছে। তথাকথিত ‘ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার’ বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আড়ালে কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবা (LeT) তাদের নাশকতামূলক কার্যক্রমের নতুন জাল বুনছে। সম্প্রতি এই কেন্দ্রে ‘নতুন ভর্তি’ কার্যক্রম শুরু হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত লস্কর নেতা ফয়সাল নাদিমকে পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তার পরিচালিত এই ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি’ এখনো কীভাবে বুক ফুলিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
নাদিমের ‘ভেক’: কারিগরি শিক্ষা না কি জিহাদি দীক্ষা?
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় (Treasury Department) এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক গ্লোবাল টেররিস্ট হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল নাদিম দীর্ঘদিন ধরে লস্করের হয়ে তহবিল সংগ্রহ ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত। পাকিস্তান সরকার চাপের মুখে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও করাচির এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি মূলত তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই কেন্দ্রে কম্পিউটার শিক্ষা বা কারিগরি দক্ষতার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করা হয়। কিন্তু ভেতরে তাদের অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক তৈরি এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের পাঠ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন একটি ‘সন্ত্রাসের কারখানা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার নাটক ও সরকারি অনুমোদনের বৈপরীত্য
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কেন্দ্রটি পাকিস্তান সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।
একদিকে সরকার নাদিমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে, অন্যদিকে তার প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর বৈধতা দিচ্ছে।
এই দ্বিমুখী নীতিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ‘নিষেধাজ্ঞার আইওয়াশ’ বা ধোঁকাবাজি হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এফএটিএফ (FATF)-এর নজরদারি থেকে বাঁচতে পাকিস্তান কাগজ-কলমে কিছু জঙ্গিকে নিষিদ্ধ করলেও তাদের আর্থিক ও কৌশলগত উৎসগুলো বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
করাচির এই কেন্দ্রটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
নতুন ভর্তি কার্যক্রম: তরুণরাই মূল লক্ষ্য
সম্প্রতি এই কেন্দ্রে নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
আকর্ষণীয় বৃত্তির প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের এখানে টেনে আনা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, এই নতুন রিক্রুটদের বড় একটি অংশকে দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা তৈরির কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে লস্কর নেতৃত্বের।
করাচির ঘিঞ্জি এলাকায় অবস্থিত এই কেন্দ্রটির ভেতরে কী ঘটে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।
তবে মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে সেখান থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা এবং ভারী মালামাল ওঠানামার খবর পাওয়া যায়।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা: কেন এই নির্লিপ্ততা?
লস্করের এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী দেশগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি অর্থায়নবিরোধী সংস্থাগুলো যেখানে কঠোর হওয়ার কথা, সেখানে পাকিস্তানের এই ‘ছায়া কার্যক্রম’ দেখেও চোখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে অনেক দেশই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত।
তবে এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে
অন্ধকারের পথে করাচি
কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে সন্ত্রাসের বিষবাষ্প ছড়ানোর এই প্রক্রিয়া করাচিকে আবারও জঙ্গিবাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত করছে।
লস্কর জঙ্গি নাদিমের এই ‘কারখানা’ যদি এখনই বন্ধ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এর খেসারত দিতে হতে পারে পুরো বিশ্বকে।
পাকিস্তানের দ্বিমুখী নীতি এবং বিশ্ব মোড়লদের উদাসীনতা—উভয়ই এই সংকটের সমান অংশীদার।
এখন সময় এসেছে পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির এবং এই ধরনের ‘ভেক’ ধরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমূলে উৎপাটন করার।
নতুবা করাচির এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বের হওয়া ‘দক্ষ জনবল’ কোনো কারখানায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের বুকেই আঘাত হানবে।
