পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফরে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে জট। ভারতের কড়া ৪ শর্ত—তিস্তায় চীন বর্জন থেকে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর দাবি।
কূটনৈতিক প্রতিবেদক | নতুন দিল্লী ও ঢাকা ১১ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় দেখল বিশ্ব। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান একগুচ্ছ দাবি ও প্রত্যাশা নিয়ে দিল্লী সফরে গিয়ে ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মুখোমুখি হয়েছেন। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ভারত এখন আর কেবল ‘দেওয়া’র নীতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং বিনিময়ে কঠোর শর্ত আদায়ের কৌশল নিয়েছে।
হাসিনা প্রত্যর্পণ ইস্যু: ভারতের ‘বেঈমানি না করার’ ঘোষণা
বৈঠকের শুরুতেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়।
তবে এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান ছিল পাথরের মতো অনড়।
অজিত দোভাল এবং জয়শঙ্কর দুজনেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শেখ হাসিনা ভারতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু, আর ভারত তার বন্ধুর সাথে ‘বেঈমানি’ করবে না।
দিল্লীর পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, যদি শেখ হাসিনার বিচার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় এবং নিরপেক্ষভাবে হয়, তবেই প্রত্যর্পণ বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
অন্যথায়, রাজনৈতিক কারণে তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হলে ভারত কোনোভাবেই তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতা এবং দলটির অস্তিত্বের প্রশ্নে ভারত কোনো আপস করতে রাজি নয়—এই বার্তাটি ছিল অত্যন্ত জোরালো।
ভারতের ‘কঠোর ৪ শর্ত’: বিনিময়ে কী চায় দিল্লী?
বাংলাদেশ এই সফরে ভারত থেকে গম, চাল, ভোজ্যতেল এবং গঙ্গা পানি চুক্তির নবীকরণের মতো অতি জরুরি বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছে।
কিন্তু এই সহযোগিতার বিনিময়ে ভারত চারটি প্রধান শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যা মেনে নেওয়া বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ:
১. তিস্তা প্রকল্পে ‘না’ চীনকে
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ভারত।
দিল্লীর দাবি, ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’-এর এত কাছে চীনের উপস্থিতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ভারত নিজেই এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে এবং কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
২. উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় (সেভেন সিস্টার্স) রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী বা কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ধরণের ছাড় দিতে নারাজ মোদি সরকার।
৩. আওয়ামী লীগকে মূল ধারায় ফেরানো
ভারতের গভীর আশঙ্কা, আওয়ামী লীগকে যদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হয়, তবে বাংলাদেশে কট্টরপন্থী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটবে।
তাই দিল্লীর শর্ত হলো, আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মূল স্রোতে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।
৪. সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও একটি সংবেদনশীল ইস্যু, তাই দিল্লী এই বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।
সহযোগিতা বনাম একনায়কতন্ত্রের তকমা: হুমকির মুখে বাংলাদেশ?
বৈঠকে ভারত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই শর্তগুলো মানলে ভারত সব ধরণের খাদ্য ও জ্বালানি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
কিন্তু শর্ত লঙ্ঘন করলে কেবল সাহায্য বন্ধই হবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি ‘একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাবে ভারত।
এতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বাংলাদেশের সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভারত এখন আর ‘একতরফা সাহায্য’ নয়, বরং ‘পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা’র নীতিতে (Reciprocity) বিশ্বাসী। দিল্লী বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা সব ধরণের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের চোখে: সংকট না কি কূটনৈতিক চাল?
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের জন্য এই সফরটি ছিল ‘আগুনের ওপর হাঁটা’র মতো।
একদিকে দেশের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রবল জনমত, অন্যদিকে ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ের বাধ্যবাধকতা।
ভারতবিরোধী অবস্থানে অনড় থাকলে দেশ চরম খাদ্য ও জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে, আবার ভারতের সব শর্ত মেনে নিলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।
এই কঠিন দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ এখন কোন পথে হাঁটবে, সেটিই দেখার বিষয়।
বিপদের মুখে বাংলাদেশ?
ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেওয়া হবে, না কি ভারত বিরোধিতার পথে হেঁটে দেশ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াবে—সেই সিদ্ধান্ত এখন ঢাকার হাতে।
দিল্লী তার দাবার গুটি সাজিয়ে রেখেছে।
এখন দেখার বিষয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দেশে ফিরে কোন বার্তা দেন এবং সরকার এই কঠিন শর্তগুলোর বিপরীতে কী অবস্থান নেয়।
