দেশের ১৭ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২৩ দিনে ১৮ শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু। জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে মানসিক চাপ ও হতাশা। নেপথ্যে কি মব জাস্টিস ও অস্থিরতা?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ১০ই মার্চ থেকে ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২৩ দিনের ব্যবধানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৮ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং দেশের আগামীর কর্ণধারদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার এক করুণ চিত্র। বিশেষ করে নিহতদের বড় একটি অংশই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন, যা এই মৃত্যুগুলোকে এক ভিন্ন মাত্রার পর্যালোচনায় নিয়ে এসেছে।
মৃত্যুর মিছিল: পরিসংখ্যানে যখন শোকের ছায়া
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২৩ দিনের এই স্বল্প সময়ে প্রাণ হারানো ১৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে:
- ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন;
- ৯ জন মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন;
- ৪ জন অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেছেন।
নিহতদের মধ্যে ৫ জন ছিলেন মেডিকেল শিক্ষার্থী।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা এই তালিকায় রয়েছেন।
জুলাই পরবর্তী মাসগুলোতে সব মিলিয়ে অংশগ্রহণকারী শতাধিক তরুণের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জুলাই চেতনার ‘পোস্ট-ট্রমাটিক’ প্রভাব ও মানসিক সংকট
নিহত শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই ২০২৪-এর আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী বিক্ষোভে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। জুলাই-আগস্টের সেই প্রবল উত্তেজনার পর যখন নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল, তখন বর্তমানের অস্থিতিশীলতা তাদের আদর্শিক জায়গায় বড় ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সহপাঠী ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে বাড়তে থাকা মব জাস্টিস বা মব সন্ত্রাস, যত্রতত্র চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা অনেক শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
তারা যে পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছিলেন, বাস্তবতার সাথে তার বৈপরীত্য দেখে অনেকেই অপরাধবোধে (Guilt Trap) ভুগছিলেন।
বিশেষজ্ঞের চোখে: আদর্শিক হোঁচট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আ ন ম কুরাইশি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, “জুলাইয়ের বিক্ষোভে তরুণদের মধ্যে যে প্রবল রোমাঞ্চ ও প্রত্যাশা ছিল, তা বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা না পাওয়ায় হোঁচট খেয়েছে।
ক্যাম্পাসগুলোতে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরে না আসা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এই ‘পোস্ট-বিপ্লব শূন্যতা’ (Post-Revolutionary Void) থেকে জন্ম নিচ্ছে গভীর ডিপ্রেশন।”
মব সন্ত্রাস ও সামাজিক অস্থিরতার নেতিবাচক ভূমিকা
জুলাই পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ রাজপথে বিভিন্ন দাবি নিয়ে সরব থাকলেও অন্য একটি অংশ ক্যাম্পাসের মব কালচার এবং সামাজিক বিচারহীনতায় মুষড়ে পড়েছে।
অনেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামাজিক চাপের সম্মুখীন হয়েছেন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের মতো মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বর্তমানে যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
এর পেছনে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও ‘জুলাই চেতনার’ কাঙ্ক্ষিত প্রতিফলন না থাকাও বড় কারণ।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি: প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সহমর্মিতা
এই অস্বাভাবিক মৃত্যু রোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।
অভিভাবকরা মনে করছেন, প্রতিটি ক্যাম্পাসে অবিলম্বে পেশাদার কাউন্সেলিং সেন্টার জোরদার করা দরকার।
- মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা: শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে বিশেষ মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা।
- নিরাপদ ক্যাম্পাস: একাডেমিক চাপ কমিয়ে একটি স্থিতিশীল ও ভীতিকরহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা।
- সামাজিক নিরাপত্তা: সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নিরাপদ পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন।
তারুণ্যের এই হাহাকার থামবে কবে?
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন আমাদের তরুণদের শক্তির পরিচয় দিয়েছিল, কিন্তু সেই শক্তিকে এখন সৃজনশীল কাজে লাগানোর বদলে আমরা যদি তাদের মৃত্যুর তালিকায় দেখতে থাকি, তবে সেটি হবে জাতির জন্য বড় পরাজয়।
তরুণ প্রজন্ম কি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাচ্ছে?
২৩ দিনে ১৮ জনের প্রস্থান কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকেত। সময় এসেছে এই মেধাবীদের মনের খবর নেওয়ার এবং তাদের জীবনকে নিরাপদ করার।
