রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সম্পাদক তৌহিদ তুহিন কারাগারে গুরুতর অসুস্থ। পুরনো জখমে পচন ধরলেও মেলেনি জামিন। বিনা চিকিৎসায় মানবেতর জীবন নিয়ে পরিবারের গভীর উদ্বেগ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র রাজনীতির এক সময়ের পরিচিত মুখ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ আল হোসেন তুহিনের জীবন প্রদীপ এখন কারান্তরালে নিভু নিভু করছে। এক সময়ের তুখোড় এই ছাত্রনেতা বর্তমানে কারাগারে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ‘মিথ্যা’ মামলায় আটক তুহিনের পায়ের পুরনো জখমে পচন ধরেছে। জরুরি উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও আদালতের পক্ষ থেকে বারবার তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হচ্ছে, যা নিয়ে মানবাধিকার ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুরনো আঘাতের ক্ষত: শিবিরের সেই নৃশংসতার স্মৃতি
তৌহিদ আল হোসেন তুহিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একজন আলোচিত নাম। তার বর্তমান এই শারীরিক অবস্থার মূলে রয়েছে বহু বছর আগের এক নৃশংস হামলা। জানা যায়, ছাত্রত্বকালীন সময়ে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে শিবির নামধারী ক্যাডারদের হাতে তিনি চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন। সেই সময় তার পায়ে ভয়াবহ জখম করা হয়েছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে তাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও সেই আঘাতের রেশ কখনোই তার শরীর থেকে মুছে যায়নি।
কারাগারে বিনা চিকিৎসা ও পচনের শুরু
বর্তমানে তুহিন একটি রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, কারাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার অভাবে তার সেই পুরনো আঘাতের স্থানে নতুন করে ইনফেকশন বা সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, তার পায়ে এখন পচন শুরু হয়েছে।
কারাগারের চিকিৎসক বা কর্তৃপক্ষ নূন্যতম প্রাথমিক সেবা দিলেও তুহিনের মতো জটিল রোগীর জন্য যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, পচন শুরু হওয়া মানেই হলো জীবনের ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
সঠিক সময়ে অপারেশন বা উন্নত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা না পেলে এই পচন পুরো শরীরে ছড়িয়ে (Sepsis) পড়ার আশঙ্কা থাকে।
আদালতের জামিন নামঞ্জুর: হতাশ স্বজনরা
তুহিনের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে তার আইনজীবীরা মানবিক কারণে জামিনের আবেদন করেছিলেন।
গত শুনানিতে তার শারীরিক পচনের বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলেও শেষ পর্যন্ত জামিন নামঞ্জুর করা হয়।
এই সিদ্ধান্তে চরম হতাশ ও শোকাহত তার পরিবার।
তুহিনের এক নিকটাত্মীয় কান্নাসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “আমরা রাজনীতি বুঝি না, আমরা শুধু তুহিনের জীবন ভিক্ষা চাই।
ওর পা পচে যাচ্ছে, ও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কারাগারে ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে, এটা কি কেউ দেখবে না?”
মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
একজন কয়েদি বা হাজতির নূন্যতম স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তার মৌলিক মানবাধিকার।
দেশের প্রচলিত আইন ও জেল কোড অনুযায়ী, কোনো বন্দি যদি গুরুতর অসুস্থ হয়, তবে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরের বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর বিধান রয়েছে।
তুহিনের ক্ষেত্রে কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা বা অবহেলা করা হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও ফিসফাস শুরু হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনো ব্যক্তির জীবন সংকটাপন্ন হওয়া রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই নামান্তর।
অপরাধী হোক বা নিরপরাধ, নূন্যতম চিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি?
তৌহিদ তুহিনের সমর্থক ও সাবেক সহপাঠীদের দাবি, এটি নিছক কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
এক সময়ের প্রভাবশালী এই নেতাকে শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্য থেকেই তাকে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তুহিনের পচন ধরা পায়ের বর্ণনা দিয়ে অনেকে তার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবি তুলেছেন।
জীবন না কি আইনি বেড়াজাল?
আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই গতি যখন কোনো মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
এস এম তৌহিদ তুহিন একজন সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে যেমন পরিচিত, তেমনি একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে তার প্রতি রাষ্ট্রের কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে।
পচন ধরা পা নিয়ে অন্ধ কারাকক্ষে তার প্রহর গোনা কি ন্যায়বিচারের পরিচায়ক?
সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা, সরকার ও আদালত মানবিক দিকটি বিবেচনা করে তুহিনের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে এবং তার জীবন রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেবে।
১০-১২ দিনের সরকারি আশ্বাস নয়, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ চায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
