আইয়ুব খান থেকে বর্তমান; বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান মানেই কি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ লক্ষ্য করলে একটি অদ্ভুত ও পুনরাবৃত্তিমূলক সমীকরণ চোখে পড়ে। যখনই এ দেশে অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, তাদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত—প্রতিটি সন্ধিক্ষণে দলটিকে নিষিদ্ধ বা রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ইতিহাসের অমোঘ সত্য এই যে, যখনই কোনো শক্তি দলটিকে দমন করতে চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিরই পতন ঘটেছে।
আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও প্রথম আঘাত (১৯৫৮–১৯৬৯)
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতে তিনি যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা। আইয়ুব অনুধাবন করেছিলেন যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ধারাটি আওয়ামী লীগ বহন করছে, তা তার গদির জন্য হুমকি।
পরিণতি: দীর্ঘ এক দশকের দমন-পীড়ন শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। আইয়ুব খানের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় এবং আওয়ামী লীগ জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ফিরে আসে।
ইয়াহিয়া খানের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় (১৯৬৯–১৯৭১)
আইয়ুবের উত্তরসূরি হিসেবে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে আবারও রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকার করেন। বন্দুকের নলের মুখে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যার সূচনা করা হয়।
পরিণতি: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কেবল ইয়াহিয়ার পতনই ঘটেনি, বরং বিশ্ব মানচিত্রে উদয় হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।
নিষিদ্ধ সেই আওয়ামী লীগই স্বাধীন দেশের প্রথম সরকার গঠন করে।
জিয়ার আমল ও ‘নিয়ন্ত্রিত’ রাজনীতি (১৯৭৫–১৯৮১)
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা জেনারেল জিয়াউর রহমান আবারও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। আওয়ামী লীগের নাম ও কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির’ নতুন এক ধারার প্রবর্তন করেন তিনি। দলটির ওপর এক অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
পরিণতি: ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৮১ সালের এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলেরও সমাপ্তি ঘটে।
শত বাধা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ পুনরায় মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়।
২০২৪-এর ‘ফ্যাসিবাদ’ ও ইউনুস প্রশাসন
সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট ক্ষমতা দখলের পর আওয়ামী লীগকে আবারও নিষিদ্ধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে অনেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যা দেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নাম দিয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠছাড়া করার এই চেষ্টা শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়।
পরিণতি: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউনুস প্রশাসনের পতনের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয় যে, জোরপূর্বক কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে দমিয়ে রাখা টেকসই নয়।
২০২৬ ও তারেক রহমানের ‘পুনরাবৃত্তি’
বর্তমান সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করা হচ্ছে, সেখানেও দল নিষিদ্ধ এবং নেতাকর্মীদের দমনের সেই পুরনো ও চেনা ছকই দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে আবারও দমনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। দল নিষিদ্ধ করা এবং বিরোধী মতকে স্তব্ধ করার এই প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।
পরিণতি: ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম অনুসারে, প্রতিটি দমনের পর একটি পাল্টা বিস্ফোরণ ঘটে।
২০২৬-এর এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ আবারও ইতিহাসের সেই পুরনো পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে।
কেন বারবার আওয়ামী লীগই লক্ষ্যবস্তু?
প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিটি অগণতান্ত্রিক শাসক কেন প্রথমেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে চায়?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দলটির শেকড়ে। আওয়ামী লীগ কোনো সাময়িক শাসকগোষ্ঠীর তৈরি দল নয়; এটি দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি জনভিত্তি সম্পন্ন দল।
স্বৈরশাসকরা জানে, এই দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখলে তাদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। তাই ‘নিষেধাজ্ঞা’ হয় তাদের শেষ অস্ত্র।
নিষিদ্ধেই কি মুক্তি?
ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করেছে যে, কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে কাগজ-কলমে নিষিদ্ধ করে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।
বরং যখনই গণতন্ত্র ফিরেছে, আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়ে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে ফিরে এসেছে।
স্বৈরশাসন এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার এই দ্বৈরথ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের জয়গানই গেয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং সুস্থ ধারার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই হতে পারে একটি উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জনগণের কণ্ঠকে দীর্ঘকাল চেপে রাখা অসম্ভব।
