কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শামীম রেজা নামের এক ‘পীর’কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা। আস্তানায় অগ্নিসংযোগ। দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মব জাস্টিস নিয়ে উদ্বেগ।
নিজস্ব প্রতিবেদক | কুষ্টিয়া ১১ এপ্রিল, ২০২৬
মব জাস্টিসের থাবায় রক্তাক্ত কুষ্টিয়া: ‘পীর’কে কুপিয়ে হত্যা ও আস্তানায় অগ্নিসংযোগ; প্রশ্নবিদ্ধ ধর্মীয় স্বাধীনতা;
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় এক পৈশাচিক ‘মব জাস্টিস’-এর সাক্ষী হলো দেশবাসী। কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি ‘আস্তানায়’ সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। কেবল হত্যাই নয়, হামলাকারীরা ওই আস্তানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে, যা এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
পুরনো ভিডিও’র জেরে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, শামীম রেজা নিজেকে পীর দাবি করে ওই এলাকায় একটি আস্তানা পরিচালনা করতেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি পুরনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হয়, যেখানে তাকে ধর্ম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করতে দেখা যায়। এই ভিডিওর জেরে স্থানীয় কিছু বিক্ষুব্ধ লোক মিছিল নিয়ে তার আস্তানায় চড়াও হয়।
হামলাকারীরা শামীম রেজাকে ঘর থেকে টেনে বের করে এলোপাতাড়ি কোপাতে ও পিটাতে থাকে।
ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা আস্তানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় সেখানে থাকা বেশ কয়েকজন ভক্তও আহত হন।
দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে ‘গণআদালত’?
নিহত শামীম রেজার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের মে মাসেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা হয়েছিল।
সেই মামলায় তিনি জেলও খেটেছিলেন। আইনগতভাবে সাজার পর তিনি মুক্তি পেয়ে পুনরায় আস্তানায় ফিরে আসেন।
কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যেভাবে তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হলো, তা নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, হামলাকারীরা সবাই স্থানীয় এবং সংখ্যায় তারা অনেক বেশি ছিল।
ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ইউনুস থেকে তারেক সরকার: ধারা কি একই?
কুষ্টিয়ার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর সাবেক ইউনুস সরকারের আমলে রাজবাড়ীতে মৃত ‘নুরা পাগলা’র কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা জানানো হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকার হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে বরং পরোক্ষভাবে আশ্রয় দিয়েছিল।
আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
মানুষ প্রশ্ন তুলছে—তাহলে কি শাসনের পরিবর্তন হলেও ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খলার ধারাটি একই রয়ে গেছে?
তারেক রহমান দেশে ফেরার সময় ‘জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কি সেই প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়?
বিপন্ন ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার
সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম ও মতাদর্শ পালনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচারের জন্য আদালত রয়েছে।
কিন্তু যেভাবে মাঝেমধ্যেই ‘ধর্ম অবমাননার’ তকমা দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি কঠোর হস্তে এই ‘মব ভায়োলেন্স’ দমন না করে, তবে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ একটি অসহিষ্ণু ও উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র ও জীবনের নিরাপত্তা সবার—এই নীতিটি বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শান্তির বদলে কি চরমপন্থা?
তারেক রহমানের সরকার দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরির ঘোষণা দিলেও কুষ্টিয়ার এই ঘটনা প্রশাসনের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
পুলিশি বয়ান অনুযায়ী এটি কেবল ‘স্থানীয় ক্ষোভ’ হতে পারে না; এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
যদি অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা কেবল কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে, না কি অতীতের মতো ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
