শেখ হাসিনা সরকারের পতন কি একটি সুপরিকল্পিত সামরিক অভ্যুত্থান? স্নাইপার জোন থেকে জেনারেলদের গোপন আঁতাত—৫ আগস্টের নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর নথিপত্র ও বিশ্লেষণ।
এনায়েত কবির | Northwest news এ প্রকাশিত; ১১ এপ্রিল, ২০২৬ঃ পর্ব-১
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে একটি ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান হিসেবে বিশ্ব দেখলেও, এর গভীরে ছিল এক অত্যন্ত জটিল এবং সুপরিকল্পিত সামরিক ছক। তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (DGFI) এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একদল উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার গোপন তৎপরতা কীভাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, তা নিয়ে বর্তমানে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। এই নিয়ে Northwest news-এ প্রকাশিত এনায়েত কবিরের প্রকাশিত বিশ্লেষন।
স্নাইপার জোন ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের ‘টার্গেটেড কিলিং’
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা পর্দার অন্তরালে থেকে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে একদল স্নাইপার মোতায়েন করা হয়েছিল। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্যে এর সত্যতা পাওয়া যায়। তিনি জানান, ৫ আগস্টের আট দিন আগেই এক সেনা কর্মকর্তা তাকে সতর্ক করেছিলেন স্নাইপারদের সম্পর্কে। এমনকি ডিজিএফআই-এর তৎকালীন কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী প্রকাশ্যে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াতকে ‘স্নাইপার জোন’ নিয়ে সতর্ক করার ঘটনাটি পরিকল্পনার গভীরতা নির্দেশ করে।
ব্যারিকেড অপসারণ ও ‘ঢাকার পথে মার্চ’
৫ আগস্ট সকাল থেকেই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে গোলন্দাজ (Artillery) ইউনিটের ব্যারিকেড থাকার কথা ছিল।
কিন্তু উত্তরা প্রবেশপথে ব্রিগেডিয়ার রফিকের কমান্ডে থাকা সেনারা হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা করতে শুরু করেন—‘কোনো কার্ফিউ নেই’।
এই ঘোষণাটি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত; কারণ এটি ছিল সরকারি আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন এবং বিক্ষোভকারীদের রাজধানীতে প্রবেশের জন্য সবুজ সংকেত।
এই নিষ্ক্রিয়তা ছিল সুপরিকল্পিত, যাতে জনতাকে গণভবনের দিকে এগিয়ে যেতে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে না হয়।
সেনাপ্রধানের কক্ষ ও গোপন যোগাযোগ
৪ আগস্ট রাতে এবং ৫ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাথে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ ছিল নিবিড়।
শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও জেনারেল জামান কীভাবে আন্দোলনকারী ও বিরোধী শিবিরের সাথে একীভূত হলেন, তা এক বড় রহস্য।
তিনি কেবল দেশীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথেই নয়, বরং ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সাথেও আলাপচারিতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
একই সময়ে ডিজিএফআই-এর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক এবং তার উত্তরসূরিদের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড ও ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ রহস্য
১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পরবর্তী বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা।
অভিযোগ উঠেছে যে, আবু সাঈদ জামায়াতে ইসলামীর একটি গোপন ইউনিটের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তার মৃত্যু পুলিশের গুলিতে না কি স্নাইপারের টার্গেটেড গুলিতে—তা নিয়ে আজও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
নিহতের মাথার পেছনের আঘাত নির্দেশ করে যে, জনরোষ উসকে দিতেই এই ‘স্যাক্রিফাইস’ বা বলিদান পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ রয়েছে।
ডিজিএফআই এবং এনটিএমসি নথিপত্র
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (NTMC) কাছে এমন কিছু কল রেকর্ড ও যোগাযোগের প্রমাণ থাকার দাবি করা হয়েছে, যা ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদের সাথে ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের গোপন যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়। এই যোগাযোগগুলো সরাসরি মার্কিন দূতাবাসের বারিধারা কার্যালয় এবং জুলকারনাইন সায়েরের মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমন্বয় করা হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ যখন রাবার বুলেট আর ছররা গুলি ব্যবহার করছিল, তখন ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের দূরপাল্লার গুলির মাধ্যমে শতাধিক সাধারণ মানুষকে হত্যার দায় সুকৌশলে সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রদ্রোহিতা না কি অধিকার রক্ষা?
৫ আগস্টের পর বিপুল সংখ্যক সামরিক কর্মকর্তার ভূমিকা এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে।
৪৬তম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড এবং ৯ম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনকে যখন ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধা দেওয়া হয়, তখন সেটি কি চেইন অফ কমান্ডের ভাঙন ছিল না কি সুচিন্তিত রাষ্ট্রদ্রোহিতা?
ইউনূস সরকারের অধীনে তদন্তের কোনো উদ্যোগ না নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া (যেমন মেজর জেনারেল হামিদুল হক) এই ষড়যন্ত্রের ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টাকেই জোরালো করে।
ইতিহাসের কাঠগড়ায় ইউনিফর্মধারীরা
৫ আগস্টের ঘটনাবলি কেবল একটি জনবিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল ইন্টেলিজেন্স এবং ইউনিফর্মধারী একদল কুশলীর নিখুঁত ড্রামা। যারা জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন, তাদেরই একটি অংশ যখন পর্দার আড়ালে বসে সরকার পরিবর্তনের ছক কাটে, তখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বড় ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই পরিকল্পনার পেছনের মূল হোতাদের শনাক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরণের ‘ইনসাইড জব’ ঘটার শঙ্কা থেকেই যাবে।
(চলবে…)
