মেগা প্রকল্পের সক্ষমতা বনাম বর্তমান প্রশাসনের অযোগ্যতা। জ্বালানি সংকট, মবতন্ত্রের উত্থান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপন্ন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
প্রফেসর ড. আরিফ খান | বিশেষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক;
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ যে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল, তা আজ এক চরম অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। একসময়ের উদীয়মান অর্থনীতির দেশটি এখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মবতন্ত্র (Mobocracy) এবং অযোগ্য শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট। দৃশ্যমান মেগা প্রকল্পগুলোর বিপরীতে বর্তমান প্রশাসনের অদূরদর্শিতা এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা বাংলাদেশকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উন্নয়নের যে গতি একসময় বিশ্বকে অবাক করেছিল, তা আজ স্থবির; আর সাধারণ মানুষের জীবন কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
অবকাঠামোর স্থবিরতা: প্রতিহিংসার বলি কি উন্নয়ন?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পগুলো ছিল সাহসিকতার পরিচয়। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পূর্ববর্তী সরকারের উন্নয়ন কাজগুলোকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে থামিয়ে দেওয়ার এক আত্মঘাতী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের দেওয়া ‘অবাস্তব প্রকল্প’ সংক্রান্ত বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা দেখছেন সরকারের নিজস্ব ব্যর্থতা ঢাকার একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে। উন্নয়ন একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হওয়া সত্ত্বেও কেবল প্রতিহিংসার কারণে চলমান কাজগুলো বন্ধ করে দেওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনছে।
ব্যবসায়িক নিরাপত্তাহীনতা ও রাজস্বের ধস
একটি রাষ্ট্র তখনই সচল থাকে যখন তার বেসরকারি খাত সচল থাকে। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের অধীনে হাজার হাজার শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী আজ কারাবন্দী কিংবা দেশান্তরী। ব্যবসায়ীরা যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ে। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার মতো চরম সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ের ওপর। রাজস্ব বাড়াতে ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, যা দেশকে দেউলিয়া হওয়ার পথে নিয়ে যাচ্ছে।
কার্ড বনাম পেট: সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস
বর্তমান সরকার ফুয়েল কার্ড, ডুয়েল কার্ড কিংবা রেশনিং কার্ডের মতো নানা ‘কাগুজে’ সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এসব কার্ড দিয়ে কি ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরবে? তপ্ত রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্বালানির লাইনে দাঁড়িয়ে কার্ডের চক্করে পড়া সাধারণ মানুষ এখন বিগত দিনগুলোর স্বস্তি খুঁজছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চরম সংকটেও যেখানে দেশের কোনো পাম্পে লাইন লাগেনি, সেখানে আজ তেলের জন্য হাহাকার কেন? অভিযোগ উঠেছে, সরকারি দলের নেতাকর্মীরাই জ্বালানি মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
জ্বালানি সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির ব্যর্থতা
বর্তমান প্রশাসনের আন্তর্জাতিক কৌশল ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ইরানের হরমুজ প্রণালী কিংবা বৈশ্বিক জ্বালানি উৎসগুলো থেকে তেল আমদানির মতো কূটনৈতিক সক্ষমতা এই সরকার দেখাতে পারছে না। ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোডশেডিংয়ের প্রভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত। মার্কিন পা চেটে কিংবা বিদেশি শক্তির ক্রীড়দাস হিসেবে ক্ষমতা দখল করলেও রাষ্ট্র পরিচালনা যে একটি ভিন্ন শিল্প, তা বর্তমানের ‘খাম্বা আছে কারেন্ট নাই’ পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক বিচ্যুতি ও ‘ডিপ স্টেট’ এজেন্ডা
এক সময়ের কট্টর বামপন্থী বা বিএনপির সমালোচক বুদ্ধিজীবীরা আজ কোন জাদুবলে সেই দলেরই উপদেষ্টা হয়ে বসলেন, তা এক বড় রহস্য।
ড. তিতুমীরের মতো যারা একসময় গরিবের ভর্তুকির কথা বলতেন, তারা আজ ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পক্ষে সাফাই গাইছেন।
এই ‘৩৬০ ডিগ্রি’ ঘুরে যাওয়া মূলত একটি বিশেষ ‘ডিপ স্টেটের’ এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
জনগণের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করাই যেন এই বুদ্ধিজীবী মহলের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মবতন্ত্র ও বিনিয়োগের শ্মশান
চাঁদাবাজি এবং মবতন্ত্রের উত্থান আজ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছে।
যেখানে রাষ্ট্র নিজেই উচ্ছৃঙ্খল মবদের কাছে জিম্মি, সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
মেগা প্রকল্পগুলোকে ‘অপচয়’ বলে গালি দিয়ে নিজের অযোগ্যতা ঢাকা সম্ভব নয়।
অর্থনীতি আজ আক্ষরিক অর্থেই আইসিইউতে, আর সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে আছে এক অসাংবিধানিক শাসনের কাছে।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ফেরার ডাক
বাংলাদেশের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
রাষ্ট্রকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে এবং উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সাংবিধানিক শাসনের কোনো বিকল্প নেই।
অযোগ্য ও অসাংবিধানিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের হাতে দেশ পরিচালনাভার তুলে দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
জেগে ওঠার সময় এখনই। উন্নয়নের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা দেখিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশে ফিরে যেতে হলে রাজপথে সোচ্চার হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
