মাওলানা ভাসানীর ‘মরণোত্তর’ ভোটদান থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক তথ্যের অসংগতি; তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে ড. আরিফ খানের বিশেষ কলাম।
লিখেছেন: অধ্যাপক ড. আরিফ খান বিশেষ কলাম | ২০ এপ্রিল, ২০২৬;
রাজনীতিতে শব্দের প্রভাব অপরিসীম, কিন্তু সেই শব্দ যদি সত্যের ভিত্তি হারায় তবে তা কেবল ট্রল বা উপহাসের খোরাক হয়। সম্প্রতি বিএনপি নেতা তারেক রহমানের কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর প্রতিটি ভুল বক্তব্য যেন এক একটি নতুন রহস্যের জন্ম দিচ্ছে। কথা বললে ‘ভুল’ হয়ে যাচ্ছে বলেই কি তিনি এখন রাজনীতির মাঠে অনেকটা ‘নির্বাক চলচ্চিত্রের’ মতো নীরবতা পালন করছেন?
মাওলানা ভাসানীর ‘মরণোত্তর’ ধানের শীষ!
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তারেক রহমানের একটি দাবি—যেখানে তিনি বলেছেন, ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের সময় মাওলানা ভাসানী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়েছিলেন। অথচ ইতিহাসের সত্য হলো, মাওলানা ভাসানী ইন্তেকাল করেছেন ১৯৭৬ সালে।
মৃত মানুষ কীভাবে কবরের বাইরে এসে ১৯৭৯ সালে ধানের শীষ তুলে দিলেন, তা নিয়ে নেটিজেনরা এখন সরব।
এটি কেবল তথ্যগত ভুল নয়, বরং ইতিহাসের চরম বিকৃতি।
সয়াবিন বনাম ভুট্টা: যখন বাস্তবতা কথা বলে
ফরিদপুরের জনসভায় চরাঞ্চলের মানুষের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেছিলেন সেখানে প্রচুর সয়াবিন চাষ হয়।
উপস্থিত জনতা সমস্বরে ‘না’ বললেও তিনি পুনরায় একই প্রশ্ন করেন।
শেষ পর্যন্ত পেছনের নেতাদের হস্তক্ষেপে জানতে পারেন সেখানে আসলে ভুট্টা চাষ হয়।
একইভাবে ২৬ বছর আগে (২০০০ সালে) নির্মিত কুমিল্লা ইপিজেডকে নতুন করে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি হাস্যরসের জন্ম দিয়েছেন।
ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো সফল প্রকল্পগুলো শেখ হাসিনা সরকার আগেই বাস্তবায়ন করলেও তিনি এখন এর কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করছেন।
ধর্মীয় অপপ্রচার ও জাইমা রহমানের ভোটব্যাঙ্ক
তারেক রহমান দাবি করেছেন বদর যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.)।
এটি ইসলামের ইতিহাসের চরম অবমাননা এবং মিথ্যাচার।
বদর যুদ্ধের সকল নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে।
তাঁর মেয়ে জাইমা রহমানের জন্য একটি নারী ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করতে গিয়ে ধর্মের এই অপব্যবহার এবং ভুল তথ্য প্রচার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের গাণিতিক অসম্ভবতা
তারেক রহমান এবং তাঁর দল দাবি করছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
চলুন গণিতের ক্যালকুলেটর দিয়ে এটি একটু যাচাই করি:
- আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের মোট বাজেট: ৪২৫ বিলিয়ন ডলার।
- পরিচালন বাজেট (অপারেটিং কস্ট): ২৭০ বিলিয়ন ডলার।
- উন্নয়ন বাজেট: ১৫৪ বিলিয়ন ডলার।
গাণিতিক প্রশ্ন হলো, যেখানে মোট উন্নয়ন বাজেটই ছিল ১৫৪ বিলিয়ন ডলার, সেখান থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার কীভাবে পাচার সম্ভব? যদি পুরো উন্নয়ন বাজেটও চুরি করা হয়, তবুও ২৩৪ বিলিয়ন পূরণ হয় না।
ইউনূস সরকারের ব্যয় ও জিডিপির তুলনা
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে এবং ২৫ বিলিয়ন ডলার বকেয়া বিল রেখে গেছে। অর্থাৎ তাদের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আওয়ামী লীগের সময় গড় ব্যয় ছিল ১৬.৮৭ বিলিয়ন ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেখানে ৫% সংকুচিত হয়েছে, সেখানে ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের ছায়া অর্থনীতি থাকলে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ তা অবশ্যই তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করত।
বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ কখনো বাংলাদেশের জিডিপি ৪৫০-৫০০ বিলিয়নের বেশি বলেনি।
যদি ২৩৪ বিলিয়ন পাচার হতো, তবে বাংলাদেশের আসল জিডিপি হতো প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার এবং প্রবৃদ্ধির হার হতো ১১%। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো সংস্থাগুলো যারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল (পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করেছিল), তারাও এই তথাকথিত ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের কোনো হদিস পায়নি।
শেষ কথা
তারেক রহমানের এই একের পর এক ভুল তথ্য, ইতিহাসের বিকৃতি এবং গাণিতিক অসংগতি প্রমাণ করে যে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি এখন কেবল মিথ্যাচারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশের মানুষকে শিক্ষিত করার চেয়ে ভুল বুঝিয়ে বা ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলে ক্ষমতায় যাওয়ার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হতে পারে।
সম্ভবত এই ভুলগুলো ধরা পড়ে যাচ্ছে বলেই তিনি এখন জনসমক্ষে কম কথা বলছেন।
কিন্তু নীরবতা সবসময় সোনার চেয়ে দামী হয় না, বিশেষ করে যখন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়।
