ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে ৮ এমপির বিশেষ সভা। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ও সংবাদকর্মী নির্যাতনের প্রতিবাদে সরব আন্তর্জাতিক মহল।
লন্ডনের হাউস অব কমন্সের ১৯ নম্বর কমিটি রুমটি গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগের এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে। ‘বাংলাদেশী ডায়াসপোরা ইন ইউকে’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ আলোচনা সভায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আটজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য (এমপি) বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংকুচিত হতে থাকা বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ এমপিদের এই অবস্থান বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করেছে।
গণতন্ত্রের সংকট: রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরোধিতায় জেরেমি করবিন
হারটলিপুলের লেবার দলীয় এমপি জনাথন ব্রাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান আকর্ষন ছিলেন লেবার দলের সাবেক নেতা জেরেমি করবিন।
তিনিসহ উপস্থিত সকল ব্রিটিশ এমপি একমত পোষণ করেন যে,
একটি কার্যকর গণতন্ত্রে কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক আদেশে নিষিদ্ধ করা বা তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম রুদ্ধ করা অগণতান্ত্রিক চর্চার নামান্তর।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু সেই মতভেদকে দমন-পীড়ন বা গণগ্রেফতারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
রিচার্ড বারজন ও জাস আথওয়াল তাদের বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন,
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ: চতুর্থ স্তম্ভের ওপর আঘাত নিয়ে হুশিয়ারি
সভায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ব্রিটিশ এমপিরা অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।
ক্রেস্টিন জারডাইন এবং গ্রাহাম মরিস স্পষ্টভাবে বলেন যে, সাংবাদিকরা হচ্ছেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী।
তাদের ভয়ভীতি দেখানো, গ্রেফতার করা কিংবা নির্যাতন করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র হতে পারে না।
বর্তমানে বাংলাদেশে সংবাদকর্মীদের যে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অলিভার রায়ান ও হেনরি টাফনেল বলেন,
একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদকর্মীদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রে সুশাসনের অভাব প্রকট হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও প্রবাসীদের ভূমিকা
প্রবাসী কমিউনিটি নেতা সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুকের পরিচালনায় এই সভায় অধ্যাপক ড. হাবিবে মিল্লাত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
প্রবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিচ্যুতিগুলো তথ্য-উপাত্তসহ তুলে ধরা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা, যার মধ্যে ব্যারিস্টার এস এম রেজাউল করিম, আবদুর রহমান, শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং আব্দুল ওয়াদুদ দারা উল্লেখযোগ্য।
সভায় উপস্থিত ব্রিটিশ এমপিরা প্রবাসীদের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।
তারা প্রতিশ্রুতি দেন যে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
কেন এই আন্তর্জাতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ এমপিদের এই উদ্বেগ কেবল একটি সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এটি নির্দেশ করে যে, বিশ্ব মোড়ল দেশগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।
১. আন্তর্জাতিক বৈধতা: রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ এমপিরা।
২. মানবাধিকার ও জিএসপি সুবিধা: ব্রিটেনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে জিএসপি সুবিধার ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ একটি বড় শর্ত।
এ ধরণের উদ্বেগ বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. প্রবাসীদের প্রভাব: যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটি ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় প্রভাব রাখে।
তাদের মাধ্যমে এই বার্তাটি ব্রিটিশ সরকারের উচ্চমহলে পৌঁছানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
গণতন্ত্রের পথে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান
লন্ডনের হাউস অব কমন্স থেকে আসা এই বার্তাটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত।
দমন-পীড়ন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনে না।
ব্রিটিশ এমপিদের এই উদ্বেগ নিরসন করতে হলে প্রয়োজন একটি অর্থবহ সংলাপ এবং সকল দলের অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চায় এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে বাকস্বাধীনতা থাকবে সুরক্ষিত এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের মতপ্রকাশের পূর্ণ অধিকার পাবে।
লন্ডনের এই সভা সেই লক্ষ্য অর্জনে একটি শক্তিশালী মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
