ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শাহবাগে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়েরের ওপর হামলার অভিযোগ। ছাত্রদল ও শিবিরের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে উত্তপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস ও পার্শ্ববর্তী শাহবাগ এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়েরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, শাহবাগ থানার সামনেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে লাঞ্ছিত করেন। প্রাণ বাঁচাতে এক পর্যায়ে ওই ছাত্রনেতা থানার অভ্যন্তরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
ঘটনার সূত্রপাত: একটি বিতর্কিত স্ক্রিনশট ও পাল্টা অভিযোগ
পুরো ঘটনার মূলে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি ও পোস্ট।
জানা গেছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ এআই (AI) জেনারেটেড ছবি ছড়ানোর অভিযোগ তোলে ছাত্রদল।
তাদের দাবি, ছাত্রশিবিরের এক কর্মী এই কাজ করেছেন।
তবে ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায় যখন ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ফেসবুকে একটি সতর্কবার্তা দেন।
তিনি দাবি করেন, পুরো বিষয়টি একটি সাজানো নাটক।
জুবায়েরের মতে, ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি করে দেশীয় অস্ত্র ঢোকানোর একটি পরিকল্পিত প্লট তৈরি করছে ছাত্রদল। তিনি অভিযোগ করেন, জনৈক শিক্ষার্থীর নামে ভুয়া স্ক্রিনশট বানিয়ে এই উত্তেজনার সৃষ্টি করা হয়েছে।
শাহবাগ থানায় মধ্যরাতে তুমুল হট্টগোল
বৃহস্পতিবার রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ থানার সামনে ভিড় বাড়তে থাকে।
একদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মামলা করার দাবিতে অবস্থান নেন, অন্যদিকে ডাকসু নেতা জুবায়েরসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেখানে উপস্থিত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
জুবায়ের ফেসবুকে লাইভ আপডেট দিচ্ছিলেন যে, শাহবাগ থানায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করা হচ্ছে।
এর কিছুক্ষণ পরেই ছাত্রদলের কর্মীদের হাতে তিনি নিজে সশরীরে লাঞ্ছিত হন বলে অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিকও এই হামলার মুখে পড়েন।
ছাত্রদল বনাম ছাত্রশিবির: ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
থানার সামনে শুধু ছাত্রনেতাদের ওপর হামলাই নয়, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এতে সাধারণ পথচারী ও সংবাদকর্মীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অবমাননার বিচার চাইতে এসেছিলেন, কিন্তু সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জুবায়েরের সমর্থকদের দাবি, “ভিকটিম” হিসেবে যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তিনি নির্দোষ এবং তাকে ফাসানোর জন্য টেকনিক্যাল কারসাজি করা হয়েছে।
জুবায়ের লিখেছিলেন, “দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাবে যদি অভিযুক্তের প্রোফাইলের স্ক্রিন রেকর্ড ও ট্রাশ ফোল্ডার পরীক্ষা করা হয়।”
ক্যাম্পাসে অস্ত্রের প্রবেশের আশঙ্কা?
ডাকসু নেতা এ বি জুবায়েরের ফেসবুক পোস্টটি ছিল বেশ চাঞ্চল্যকর।
তিনি সরাসরি ছাত্রদলের দিকে আঙুল তুলে লিখেছিলেন যে, ক্যাম্পাসে রামদা, কিরিচ ও চাপাতি ঢোকানোর পরিবেশ তৈরি করতেই এই ‘গ্যাঞ্জাম’ লাগানো হচ্ছে।
তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালে।
পুলিশের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি
শাহবাগ থানা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খায়।
থানার ভেতরে ডাকসু নেতাদের আটকে পড়ার ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উভয় পক্ষের অভিযোগ শোনা হচ্ছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শাহবাগ ও তৎসংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ছাত্র রাজনীতির নতুন মেরুকরণ?
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পর ডাকসু নেতাদের ওপর এ ধরনের সরাসরি হামলার ঘটনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর যে অভিযোগ জুবায়ের তুলেছেন, তা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সারসংক্ষেপ:
- জাইমা রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত পোস্টের জেরে ছাত্রদলের মামলা করার উদ্যোগ।
- ডাকসু নেতা জুবায়েরের দাবি—এটি সাজানো নাটক ও ক্যাম্পাসে অস্ত্র ঢোকানোর প্লট।
- শাহবাগ থানার সামনে জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলার অভিযোগ।
- ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং উত্তপ্ত ঢাবি এলাকা।
