ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়; ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে উগ্রবাদী আদর্শের প্রচার ও ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে এক বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্ট। পড়ুন বিস্তারিত।
৫ই আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল। কিন্তু এই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর অবকাঠামো থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উগ্রবাদী মতাদর্শের একটি গোপন ‘নেক্সাস’ বা যোগসূত্র তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বিশিষ্ট গবেষক ও বিশ্লেষক আসিফ বিন আলীর এক পর্যবেক্ষণমূলক বক্তব্য দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে উগ্রবাদী প্রচারকদের মূলধারার প্লাটফর্মে নিয়ে আসছে।
ক্যান্টনমেন্টের মসজিদে ‘সেলিব্রিটি’ প্রচারক: নেপথ্যে কারা?
পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের মসজিদগুলোতে জুম্মার খুতবা দিতে দেখা গেছে এমন কিছু ব্যক্তিদের,
যারা আল-কায়েদা কিংবা দায়েশ-পন্থী (আইএস) মতাদর্শের সাথে সম্পৃক্ত নিউ জেএমবি ঘরানার হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন উঠেছে, কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত এই সংবেদনশীল এলাকায় কারা এই ধরনের উগ্রপন্থী সেলিব্রিটি প্রচারকদের প্রবেশের সুযোগ করে দিল?
এই আমন্ত্রণ কি কেবলই ধর্মীয় আবেগ থেকে, নাকি এর পেছনে কোনো সুগভীর ষড়যন্ত্র ছিল—তা খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।
তিন ‘বিশেষ সাংবাদিক’ ও ‘জঙ্গি নাটক’ তত্ত্ব
উগ্রবাদী এই নেক্সাসের অন্যতম ঢাল হিসেবে কাজ করছেন তিনজন ‘বিশেষ সাংবাদিক’।
তাদের মূল কাজ হলো—বিগত বছরগুলোতে যারা উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে কারাগারে ছিল, তাদের সমাজে নির্দোষ এবং ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপন করা।
অভিযোগ রয়েছে,
এই সাংবাদিকরা বিগত ১৬ বছরের সকল জঙ্গি দমন অভিযানকে ‘জঙ্গি নাটক’ হিসেবে প্রচার করে এই অশুভ শক্তিকে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করছেন। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই তিন সাংবাদিকের গতিবিধি, কাজের ধরন এবং আয়ের উৎস বিশ্লেষণ করলে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সূত্র পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাডেমিয়ায় থাবা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি ক্যাম্পাস
এই নেক্সাস কেবল সেনানিবাসে সীমাবদ্ধ নেই।
আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের নামকরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই উগ্রপন্থী ঘরানার প্রচারকদের অবাধ বিচরণ দেখা গেছে।
আমন্ত্রণকারী কারা: বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ক্লাব বা কোন শিক্ষকরা এই বিতর্কিত ব্যক্তিদের খুতবা বা আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
ডিজিটাল উগ্রবাদ: অভিযোগ উঠেছে, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাদের ফেসবুক ওয়ালে উগ্রবাদী সংগঠনের (দায়েশ) পতাকা ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন।
উচ্চশিক্ষার পীঠস্থানে এমন প্রকাশ্য উগ্রবাদ চর্চা তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সহাবস্থান বনাম জাতীয় নিরাপত্তা
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান থাকা স্বাভাবিক এবং কাম্য।
কিন্তু যারা সহিংস উপায়ে সাংবিধানিক রাষ্ট্র কাঠামোকে ধ্বংস করতে চায় এবং ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নাশকতা চালায়, তাদের সাথে রাজনৈতিক সহাবস্থানের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
আসিফ বিন আলীর মতে, রাজনীতিবিদদের সাথে রাজনীতি হতে পারে, কিন্তু সন্ত্রাসীদের সাথে আপস মানেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল করা।
মানবাধিকার রক্ষা: রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান
উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এমনকি ‘আলফা-মেল’ ঘরানার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রেও যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকে রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে।
কারণ, মানবাধিকারের প্রতি এই দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের কোনো দুর্বলতা নয়;
বরং এটি উগ্রবাদের বিরুদ্ধে একটি সভ্য সমাজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
জনগণের আস্থা কেবল তখনই টিকে থাকবে যখন রাষ্ট্র ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখবে।
“সন্ত্রাসীদের সাথে সহাবস্থান হয় না; কারণ যারা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে ধর্ম ব্যবহার করে, তারা কোনো রাজনৈতিক শক্তির অংশ হতে পারে না। মানবাধিকার রক্ষা করেই এই অশুভ শক্তিকে নির্মূল করতে হবে।”
শেষ কথা
৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে যদি সত্যিই উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়ে থাকে, তবে তা মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
ছদ্মবেশী সাংবাদিক, সুবিধাবাদী শিক্ষক এবং পর্দার আড়ালের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা না গেলে এই ‘নেক্সাস’ একদিন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেই গ্রাস করে ফেলবে।
সচেতন নাগরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এই অশুভ চক্রের হাত থেকে ক্যাম্পাস ও ক্যান্টনমেন্ট রক্ষার শপথ নিতে হবে।
