গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে তালেবান কমান্ডার নুর আহমেদ ও বিতর্কিত মাওলানাদের আনাগোনা। নির্বাচিত সরকারকে সংকটে ফেলতে উগ্রবাদের এই মহড়া কার ইশারায়?
একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের পর যেকোনো জাতির প্রধান লক্ষ্য থাকে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। যেখানে আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা ছিল বিশ্বখ্যাত শিক্ষাবিদ, দার্শনিক কিংবা বিজ্ঞানীদের, সেখানে এক রহস্যময় পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। গত কয়েক মাসে দেশের মাটিতে পা রেখেছেন তালেবান সরকারের প্রতিনিধি দল এবং বিতর্কিত সব ধর্মীয় চরিত্র। প্রশ্ন উঠেছে, নবজাতক গণতন্ত্রকে আঁতুড়ঘরেই শ্বাসরোধ করতে উগ্রবাদের এই বিষবৃক্ষ কারা রোপণ করছে? কেন হঠাৎ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে টার্গেট করা হচ্ছে? এই ষড়যন্ত্রের মূলে পৌঁছানো এখন কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান শর্ত।
তালেবান কমান্ডার থেকে আফগান দূত: নুর আহমেদ নুর রহস্য
২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন তালেবান কমান্ডার নুর আহমেদ নুর। এই সফরের ঠিক এক মাস পর তাকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের ‘পাপেট’ বা হাতের পুতুল হওয়ার পুরস্কারস্বরূপ আফগান দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একজন বিতর্কিত সামরিক কমান্ডারকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর নেপথ্যে কার মস্তিষ্ক কাজ করেছে?
গোয়েন্দা সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, নুর আহমেদ নুরের এই সফর ছিল মূলত বাংলাদেশের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে এক অদৃশ্য যোগসূত্র তৈরির প্রাথমিক ধাপ। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক সফর ছিল না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদের নতুন ‘নোড’ হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহারের এক সুদূরপ্রসারী নকশা।
মাজহার শাহ সাঈদ ও ‘ডিজেল মাওলানা’: উগ্রবাদের নতুন পোস্টার
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার নামে ডেকে আনা হয়েছে মাজহার শাহ সাঈদ এবং তথাকথিত ‘ডিজেল মাওলানা’র মতো বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিদের। এদের কার্যক্রম এবং বয়ান অতীতেও বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদের প্রসার ঘটিয়েছে। অথচ এদের পরিবর্তে বিজ্ঞান বা দর্শনের কোনো নক্ষত্রকে তরুণদের সামনে নিয়ে আসা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে নির্বাচিত সরকারকে অকার্যকর প্রমাণ করতে এবং দেশে একটি ‘ফেইলড স্টেট’ বা ব্যর্থ রাষ্ট্রের ইমেজ তৈরি করতে এই উগ্রবাদীদের মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে। এরা তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে টার্গেট: দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনার অংশ?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর হামলার আশঙ্কা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থাকে টার্গেট করার যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
- কেন এই টার্গেট: রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে দেওয়াই এই গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য।
- কারা নেপথ্যে: যারা গণতন্ত্রের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে দিতে চায় না, তারাই এই উগ্রবাদের কার্ড ব্যবহার করছে। এরা চায় আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে একটি ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করতে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়।
নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ছক
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত সরকারকে শুরু থেকেই নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
একদিকে অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে উগ্রবাদের এই পরিকল্পিত উত্থান।
যখনই সরকার স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা করছে, তখনই কোনো না কোনো উগ্রবাদী ইস্যু সামনে এনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হচ্ছে।
এই উগ্রবাদের মঞ্চস্থ ক্ষেত্র যারা তৈরি করেছে, তাদের খুঁজে বের করা না গেলে অচিরেই দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
“শিক্ষার বদলে যখন উগ্রবাদের চাষ হয়, তখন সেই জমিতে গণতন্ত্রের ফসল ফলে না। যারা তালেবান কমান্ডার বা বিতর্কিত মাওলানাদের মঞ্চ তৈরি করে দিচ্ছে, তারা মূলত দেশের তরুণ প্রজন্মকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
প্রশাসনের ভূমিকা ও সমূলে উৎপাটনের গুরুত্ব
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল সতর্কবার্তা দিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই অশুভ গোষ্ঠীকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে:
১. তহবিল অনুসন্ধান: এই বিতর্কিত ব্যক্তিদের আনার খরচ এবং তাদের স্পন্সরদের পরিচয় জনসমক্ষে আনতে হবে।
২. যোগসূত্র চিহ্নিতকরণ: পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের ‘পাপেট’ রাজনীতির সাথে এদেশীয় দালালদের যে সংযোগ, তা বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
৩. একাডেমিক নিরাপত্তা: বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণদের ক্লাবে কারা এই উগ্রবাদীদের ঢোকাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চারণভূমি হতে পারে না। গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন এবং প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠন।
যারা উগ্রবাদকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচিত সরকারকে বিপদে ফেলতে চায়, তারা মূলত দেশের জনগণের শত্রু।
সময় এসেছে এই ‘পাপেট’ নেটওয়ার্ককে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার।
