নির্বাচনের পরও দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। বিনিয়োগ স্থবিরতায় উদ্বেগ বাড়ছে অর্থনীতিতে।
বিনিয়োগে প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নতির আশা করা হলেও বাস্তবে সেই গতি দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিল্প খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি এখনো স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে এই খাতে নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১০.৫ শতাংশ।
কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যেও একই চিত্র
শুধু মূলধনী যন্ত্রপাতিই নয়, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিতেও একই ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে:
- মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা কমেছে ৪.৯১%
- নিষ্পত্তি কমেছে ১২.৯৩%
- কাঁচামালের এলসি খোলা কমেছে ২.৬৭%
- নিষ্পত্তি কমেছে ৫.৪২%
সব মিলিয়ে আমদানি কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে, যা শিল্প উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিনিয়োগে আস্থাহীনতার কারণ
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- নির্বাচন-পূর্ব দীর্ঘ অনিশ্চয়তা
- উচ্চ সুদের হার
- ডলারের মূল্য বৃদ্ধি
- গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এর প্রভাব। যদিও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি রয়েছে, তবুও এর অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো কাটেনি।
রপ্তানি কমে প্রভাব পড়ছে আমদানিতে
বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের রপ্তানি আয় কমেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে, যা সরাসরি আমদানির সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকলে আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে পড়ছেন।
অর্থনীতিতে নেতিবাচক সংকেত
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ এটি সরাসরি নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর গবেষক এম হেলাল আহম্মেদ জনি বলেন, “নতুন বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। মূলধনী যন্ত্রপাতি কমলে কর্মসংস্থানও কমে যাবে।”
বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিও তলানিতে
বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.০৩ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্নের মধ্যে একটি।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমান ঋণ প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে সুদের হার বৃদ্ধি ও অনাদায়ী সুদের কারণে, প্রকৃত বিনিয়োগ থেকে নয়।
নীতিগত সহায়তার দাবি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে:
- সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা
- ডলার বাজার স্থিতিশীল করা
- জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা
- বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি
নির্বাচনের পরও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসা দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, শিল্প খাতে নতুন গতি আনতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
