বরিশালের মুলাদীতে শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করায় বিধবা বৃদ্ধাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে টাকা দাবির অভিযোগে মামলা দায়ের। জানুন লোমহর্ষক এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য।
বরিশালের মুলাদী উপজেলায় এক বিধবা বৃদ্ধাকে (৫৫) সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে চাঁদা দাবির এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করার জেরে পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধ সংঘটিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ভুক্তভোগী নারী নিজে বাদী হয়ে বরিশাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত: ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদে ক্ষোভ
মামলার আরজি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,
উপজেলার চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত জব্বার ব্যাপারীর ছেলে হালিম ব্যাপারী (৬০) দীর্ঘদিন ধরে ওই বিধবা বৃদ্ধাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন।
বৃদ্ধার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের সময় অভিযুক্ত হালিম প্রায়ই অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতেন এবং অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন।
একজন প্রবীণ নারী হিসেবে এই অপমানের বিচার পেতে তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে অভিযোগ জানান।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হালিম ব্যাপারী তাকে জনসমক্ষে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। মূলত সেই প্রতিহিংসা থেকেই এই পৈশাচিক ঘটনার ছক আঁকা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্ধকার রাতের সেই পৈশাচিকতা
গত ২২ এপ্রিল দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটে সেই লোমহর্ষক ঘটনা।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, হালিম ব্যাপারী এবং তার সহযোগী মাসুদ খন্দকার (৪০) কৌশলে বৃদ্ধার ঘরে প্রবেশ করেন। ঘরে ঢুকেই তারা বৃদ্ধাকে জিম্মি করে ফেলেন।
প্রথমে হালিম ব্যাপারী বৃদ্ধাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন এবং সহযোগী মাসুদ খন্দকার সেই মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন। এরপর মাসুদ নিজেও ওই নারীকে ধর্ষণ করেন।
এই নারকীয় তাণ্ডব চালানোর পর তারা ভুক্তভোগীকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘর ত্যাগ করেন।
ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং ও টাকা দাবি
ধর্ষণের পর থেমে থাকেনি অপরাধীরা। ঘটনার পরদিন থেকে ধারণকৃত ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বৃদ্ধার কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
অসহায় ওই নারী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার হুমকি দিতে থাকে।
লোকচক্ষুর অন্তরালে বিচার পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী প্রথমে স্থানীয় মাতব্বরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।
কিন্তু সেখানে প্রভাবশালী মহলের চাপে বিচার পেতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ঘটনার ৮ দিন পর আদালতের শরণাপন্ন হন তিনি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার বিষয়ে মূল অভিযুক্ত হালিম ব্যাপারীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
তবে তিনি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন,
“মাসুদ খন্দকার ওই বৃদ্ধার কিছু ভিডিও ধারণ করেছিল এবং তা অনেকের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে চাঁদা দাবির বিষয়টি আমার জানা নেই।”
তার এই মন্তব্য পরোক্ষভাবে অপরাধের সত্যতাকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ ও আদালতের পদক্ষেপ
মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার মো. সোহেল রানা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন,
“আমরা জানতে পেরেছি বৃদ্ধাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে।
আদালতের মামলার কপি থানায় পৌঁছেছে। আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।”
অপরাধ বিশ্লেষকদের অভিমত
সমাজে নারীর নিরাপত্তা, বিশেষ করে একজন বিধবা বৃদ্ধার ওপর এমন বর্বরতা নৈতিক অবক্ষয়ের চরম সীমা নির্দেশ করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেতেই থাকবে।
এলাকাবাসীর দাবি
চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় স্তম্ভিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিবেশী বলেন,
“হালিম ও মাসুদের মতো লোকজনের জন্য গ্রামে মা-বোনদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। আমরা চাই পুলিশ দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠাক।”
একজন বৃদ্ধা নারী তার সম্ভ্রম হারানো এবং পরবর্তীতে ভিডিও ভাইরালের হুমকিতে বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
প্রশাসনের উচিত দ্রুত আসামিদের আইনের আওতায় এনে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করা।
