কুমিল্লার চান্দিনায় আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে স্বামীকে আটকে রেখে এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় ৪ জনকে আটক করেছে।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে। আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে এক গৃহবধূকে তার স্বামীর সামনে থেকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে একদল নরপশু। রোববার দিবাগত মধ্যরাতে উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের কামারখোলা গ্রামে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে পুলিশ চারজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: যখন নিরাপত্তা হারাল ধ ধুঁ ধুঁ প্রান্তর
জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামী কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা সদরের বাসিন্দা।
রোববার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তারা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে চান্দিনার মাদারপুর গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
কিন্তু রাত ১০টার দিকে কামারখোলা গ্রাম এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ অটোরিকশাটির চার্জ শেষ হয়ে যায়।
নির্জন রাস্তায় কোনো উপায় না দেখে স্বামী-স্ত্রী মিলে অটোরিকশাটি ঠেলে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটি মোটরসাইকেলে করে তিন যুবক এসে তাদের গতিরোধ করে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।
সাহায্যের বদলে মিলল নৃশংসতা
ভুক্তভোগীর স্বামী জানান, মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক প্রথমে তাদের জেরা করতে থাকে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ফোনে আরও দুই সহযোগীকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনে।
এরপর শুরু হয় পাশবিকতা। যুবকরা স্বামীকে মারধর করে অন্ধকারে দূরে সরিয়ে দেয় এবং এক সন্তানের জননী ওই নারীকে টেনে-হিঁচড়ে পাশের একটি ভুট্টাখেতে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগীর আর্তনাদ: “কেউ আমাকে বাঁচাতে আসেনি”
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই নারী গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে সেই বিভীষিকাময় সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন,
“ওরা আমাকে জোর করে ভুট্টাখেতের ভেতর নিয়ে যায়। আমি ওদের হাত-পা ধরেছি, অনেক কেঁদেছি, কিন্তু ওদের মনে দয়া হয়নি। একের পর এক তারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি চিৎকার করেছি, কিন্তু সেই রাতে কেউ আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।”
৯৯৯-এ কল এবং পুলিশের ত্বরিত অভিযান
স্ত্রীর বিপদের কথা আঁচ করতে পেরে তার স্বামী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন।
কল পাওয়ার সাথে সাথেই চান্দিনা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধীরা পালানোর চেষ্টা করলেও হাতেনাতে ৪ জনকে ধরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেফতারকৃতদের পরিচয়
পুলিশের অভিযানে আটককৃত অভিযুক্তরা হলো:
১. মো. আশিক (৩১) – পিতা: শাহজাহান মিয়া, গ্রাম: মাদারপুর।
২. মেহেদী হাসান তারেক (২৪) – পিতা: আলমগীর হোসেন, গ্রাম: কামারখোলা।
৩. মো. আরিফ (৩৪) – পিতা: আলমাছ মিয়া, গ্রাম: কামারখোলা।
৪. মো. ইসমাইল (৩৭) – পিতা: মৃত জয়নাল আবেদীন, গ্রাম: কামারখোলা।
পুলিশ প্রশাসন যা বলছে
চান্দিনা থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) আতিকুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এই ঘৃণ্য অপরাধে মোট পাঁচজন জড়িত ছিল। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দুই জন সরাসরি ধর্ষণে অংশ নেয় এবং বাকিরা সহযোগিতার পাশাপাশি ধর্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তিনি আরও বলেন, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করি এবং চারজনকে গ্রেফতার করি। ভুক্তভোগী নারী নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। তাকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (OCC) পাঠানো হয়েছে। পলাতক অপর আসামিকে ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।”
আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক প্রত্যাশা
এই ঘটনায় চান্দিনা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। তারা মনে করেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই নরপশুদের বিচার সম্পন্ন করা হলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পাবে।
