১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরও মাঠে সেনাবাহিনী। ডিসি সম্মেলনে সেনাপ্রধানের বার্তা এবং বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক কর্তৃত্বর নেপথ্য সমীকরণ নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি বহুল আলোচিত সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও রাজপথ থেকে এখনো সরিয়ে নেওয়া হয়নি সামরিক বাহিনীকে। নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার গুঞ্জন থাকলেও বর্তমানে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৩ মে থেকে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টার অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশ এই মুহূর্তে এক অনন্য ‘বেসামরিক-সামরিক’ সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই অন-গ্রাউন্ড উপস্থিতি কি পরোক্ষ কোনো শাসনের সংকেত না কি রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই এই দীর্ঘসূত্রতা?
ডিসি সম্মেলন ২০২৬: সেনাপ্রধানের কড়া বার্তা
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে এক শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেন।
তিনি জানান, সেনাবাহিনী কেবল একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে “স্ট্রাইকিং ফোর্স” হিসেবে মোতায়েন থাকবে।
দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা যেকোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ডিসিদের অনুরোধে সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক সাড়া দেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সেনাপ্রধানের মতে, এই সমন্বিত কর্মকাণ্ডের ফলে সামরিক বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেসামরিক প্রশাসনের ওপর ‘সামরিক কর্তৃত্ব’?
সম্মেলনে উপস্থিত বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমানে কার্যকরভাবে সামরিক কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে মাঠ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করার যে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, তাকে অনেকেই ‘পরোক্ষ সামরিক শাসন’ হিসেবে দেখছেন। যদিও নির্বাচনের আগে সেনাপ্রধান বলেছিলেন সেনাবাহিনী ক্লান্ত এবং তারা ব্যারাকে ফিরে যেতে চায়, তবে বর্তমান তারেক রহমান সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সামরিক বাহিনীর এই উপস্থিতি বজায় রাখতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সেনাবাহিনীর ছায়া
বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব আধা-সামরিক ও জরুরি সেবা সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন সামরিক কর্মকর্তারা:
- বিজিবি ও আনসার: বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তারা।
- ফায়ার সার্ভিস ও র্যাব: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের শীর্ষ পদ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-ও কার্যকরভাবে সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন।
- মাঠ প্রশাসন: সেনাসদরের একটি সূত্রের মতে, বর্তমান পুলিশ ও জেলা প্রশাসন এখনো সামরিক সহায়তা ছাড়া সম্পূর্ণভাবে ‘সক্ষম’ হয়ে ওঠেনি, যা বেসামরিক প্রশাসনকে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতা ও রাজনৈতিক অবস্থান
৫ মে সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম জানান, জাতীয় স্বার্থেই ডিসিদের সেনাবাহিনীর সাথে নিবিড় সমন্বয় রাখতে হবে।
সরকার সামরিক বাহিনীকে আরও ‘জনমুখী’ করতে চায় এবং ভবিষ্যতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডিসিদের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, সেনাপ্রধান জেনারেল জামান ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ‘অসাধারণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি ডিসিদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন যে,
অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও তারা জাতিকে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে সেনাবাহিনী কেবল পার্শ্ববর্তী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
মাঠ পর্যায়ের সক্ষমতা ও অনিশ্চিত গন্তব্য
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্যমতে, এবারের সম্মেলনে ডিসিদের কাছ থেকে ১,৭২৯টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে যার মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রয়েছে।
তবে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে প্রশাসনের ওপর সামরিক বাহিনীর এই ‘ছায়া কর্তৃত্ব’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্যারাকে ফেরার বিষয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যাওয়ায় দেশের বেসামরিক কাঠামোর স্বকীয়তা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’
১২ ফেব্রুয়ারি একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি প্রশাসন কেন সামরিক বাহিনীকে মাঠ থেকে সরাচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে।
সেনাসদরের মূল্যায়নে পুলিশ ও প্রশাসন এখনো একা চলার মতো সক্ষমতা অর্জন করেনি
—এই যুক্তিটি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যেতে পারে।
বেসামরিক প্রশাসনের এই ‘সামরিক নির্ভরতা’ কি স্থিতিশীলতা আনবে না কি গণতন্ত্রের স্বকীয়তাকে ম্লান করবে—তা সময়ই বলে দেবে।
তবে আপাতত, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের এই ডিসি সম্মেলন এ বার্তাই দিচ্ছে যে, সেনাবাহিনী ব্যারাকে নয়, মাঠেই থাকছে।
