মধ্যমগ্রামে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু, গুরুতর আহত সঙ্গী বুদ্ধদেব। নেপথ্যে কোন রাজনীতি?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ময়দান আবারও রক্তে রঞ্জিত হলো। এবার খোদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে খুন করল দুষ্কৃতীরা। বুধবার রাতের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে শুধু চন্দ্রনাথই নন, তাঁর সঙ্গী বুদ্ধদেব বেরাও গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ার এই ঘটনা কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অপারেশন মধ্যমগ্রাম: যেভাবে চালানো হলো হামলা
বুধবার রাতটি ছিল চন্দ্রনাথের জন্য এক মরণফাঁদ।
স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ৪টি বাইকে মোট ৮ জন দুষ্কৃতী দীর্ঘক্ষণ ধরে চন্দ্রনাথের গাড়িটি পিছু নিচ্ছিল।
গাড়িটি যখন মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়া লেনের ভেতরের একটি গলিতে প্রবেশ করতে যায়, ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে আসা হেলমেটধারী হামলাকারীরা গাড়ি লক্ষ্য করে অন্তত ৪ রাউন্ড এলোপাথাড়ি গুলি চালায়।
তদন্তকারী ও স্থানীয়দের ধারণা, হামলাকারীরা চন্দ্রনাথের গতিবিধি সম্পর্কে আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল।
গলিটির ভেতরে গাড়িটি ঢুকলে পালানোর পথ সরু হয়ে যাবে—এই ছক কষেই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালানো হয়।

চিকিৎসকের ভাষ্য: বুকের বাঁ দিকে বিঁধেছে বুলেট
হাসপাতালের কর্ণধার প্রতিম সেনগুপ্ত জানান, চন্দ্রনাথকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তাঁর শরীরে প্রাণের কোনো স্পন্দন ছিল না। তাঁর বুকের বাঁ দিকে দুটি গভীর ক্ষত ছিল।
সিপিআর দিয়েও তাঁকে ফেরানো যায়নি।
অন্যদিকে, তাঁর সঙ্গী বুদ্ধদেবের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর পেটে, হাতে এবং বুকের ডান দিকে মোট ৩টি গুলি লেগেছে।
প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে, যেখানে তাঁর জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
কে এই চন্দ্রনাথ? শুভেন্দুর ‘টিম ভবানীপুর’-এর গুরুত্বপূর্ণ মুখ
আদতে পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা হলেও চন্দ্রনাথ রথ দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ২৪ পরগণার মধ্যমগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন।
বিজেপির রাজনৈতিক মহলে তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও দক্ষ কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বিশেষ করে ভবানীপুর উপ-নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর যে বিশেষ ‘কোর টিম’ কাজ করেছিল, তার অন্যতম ভরসাযোগ্য সদস্য ছিলেন চন্দ্রনাথ।
তাঁর সঙ্গী বুদ্ধদেবও সেই টিমেরই সক্রিয় কর্মী।
দলের এমন বিশ্বস্ত যোদ্ধাদের টার্গেট করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন নেতারা।
হাসপাতালে শুভেন্দু ও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই মধ্যমগ্রামের হাসপাতালে পৌঁছে যান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
তাঁর চোখেমুখে ছিল শোক ও ক্ষোভের ছাপ।
এছাড়াও শঙ্কর ঘোষ, কৌস্তভ বাগচী, রাজু বন্দ্যোপাধ্যায় ও পীযূষ কানোরিয়ার মতো প্রথম সারির বিজেপি নেতারা হাসপাতালে জড়ো হন।
হাসপাতালের বাইরে হাজার হাজার বিজেপি কর্মীর ভিড় এবং উত্তপ্ত স্লোগান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এটি কি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা নতুন কিছু নয়।
তবে বিরোধী দলনেতার একান্ত কাছের মানুষকে এভাবে খতম করা একটি ‘ক্লিয়ার মেসেজ’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
- গোয়েন্দা ব্যর্থতা: জনবহুল এলাকায় বাইক নিয়ে এসে আটজন দুষ্কৃতী অপারেশন চালিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল, যা স্থানীয় গোয়েন্দা ও পুলিশের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
- টার্গেট কিলিং: যেভাবে গাড়িটিকে ট্র্যাপ করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে এটি কোনো তাৎক্ষণিক ঝামেলা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রেইকি বা নজরদারির ফসল।
বিচার না কি রাজনৈতিক চাপানউতোর?
চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু বিজেপির জন্য এক বিশাল সাংগঠনিক ক্ষতি।
শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার পর কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
পুলিশি তদন্ত শুরু হলেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন—আসল দোষীরা কি ধরা পড়বে, না কি এটিও ‘তদন্তাধীন’ ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাবে?
মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ার গলিটি আজ শান্ত থাকলেও চন্দ্রনাথের রক্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছে, তার আঁচ বহুদূর পর্যন্ত যাবে—তা বলাই বাহুল্য।
