উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহতের ঘটনায় ড. ইউনূস ও আসিফ নজরুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন। আদালতের জবানবন্দি রেকর্ড ও পরবর্তী আদেশ।
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘটিত সেই লোমহর্ষক বিমান দুর্ঘটনার রেশ কাটেনি আজও। ৩৬ জন তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই পৈশাচিক ট্র্যাজেডির ঘটনায় এবার আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন জমা পড়েছে আদালতে। এই মামলাটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং স্বজনহারা পরিবারের বিচার পাওয়ার এক আর্তনাদ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আদালতের কার্যক্রম: স্বজনহারা পিতার লড়াই
আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে মামলার এই আবেদনটি করেন নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা উসাইমং মারমা।
বাদীপক্ষের আইনজীবী এ কে এম শারিফ উদ্দিন জানান,
আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন এবং এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।
মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা ড. রেজওয়ানা হাসান এবং সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ১৬ জন ব্যক্তি।
অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অবহেলা এবং যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করার ফলেই এমন অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ২১ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত দুপুর
২০২৫ সালের ২১ জুলাই। দিনটি উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার মানুষের জন্য ছিল বিভীষিকাময়।
বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওপর আছড়ে পড়ে।
বিকট শব্দে অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংসস্তূপে মুহূর্তেই পরিণত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।
- নিহতের সংখ্যা: দুর্ঘটনায় মোট ৩৬ জন নিহত হন।
- শিক্ষার্থীদের মৃত্যু: নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী।
- পাইলটের মৃত্যু: বিমানের চালক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও এই দুর্ঘটনায় শাহাদাত বরণ করেন।
কেন এই মামলা? দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তৎকালীন সরকার
বাদীপক্ষের অভিযোগ, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্পর্শকাতর স্থাপনা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধিনিষেধ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সুরক্ষিত জায়গায় কেন এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটল, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা দায়ভার সেই সময়কার শীর্ষ কর্তারা গ্রহণ করেননি।
ড. ইউনূস ও আসিফ নজরুলের মতো ব্যক্তিদের এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে বাদীর যুক্তি হলো, সরকার প্রধান এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে তারা এই যান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না।
এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ব্যবস্থাপনার চরম অযোগ্যতা বলে দাবি করছেন নিহতের স্বজনরা।
আইনি বিশ্লেষণ ও জনমত
আইনজীবীদের মতে, এই ধরণের মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ আনা হতে পারে।
যদি আদালত মামলার আবেদনটি গ্রহণ করেন, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অন্যতম চাঞ্চল্যকর মামলা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই মামলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কেন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিমান মহড়া চালানো হয়? নিহত শিক্ষার্থীদের সহপাঠী ও অভিভাবকরা দীর্ঘ দিন ধরেই এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছিলেন।
ইনসাফের অপেক্ষায় শোকাতুর পরিবার
উক্য ছাইং মারমার বাবা উসাইমং মারমা আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, “আমার সন্তান আর ফিরবে না, কিন্তু আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়।
আমি চাই দোষীরা চিহ্নিত হোক।” মাইলস্টোন স্কুলের দেয়ালগুলো আজ স্তব্ধ হয়ে থাকলেও নিহতের স্বজনদের কান্না আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে।
মামলার পরবর্তী আদেশের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।
বিচার বিভাগ কি এই প্রভাবশালী ১৬ জনের বিরুদ্ধে সমন জারি করবে? না কি ফাইলবন্দি হবে ৩৬টি জীবনের গল্প? উত্তরের অপেক্ষায় পুরো দেশ।
