দুই মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমির অভিযোগ, মবের চাপেই পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করতে বাধ্য হয়েছিল।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তারের প্রায় দুই মাস পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন, “মবের চাপেই পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হয়েছিল।”
৭ মার্চ রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় শেখ মুজিবুর রহমান–এর ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে আটক করা হয়। পরদিন শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
কী ঘটেছিল ৭ মার্চ?
চলতি বছরের ৭ মার্চ সন্ধ্যায় শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক এই ভিপি। পরে রিকশায় মাইক ব্যবহার করে ভাষণ প্রচারের সময় একদল শিক্ষার্থী বাধা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের, মুসাদ্দিককে আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং জাতীয় ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মোদাসসিরসহ কয়েকজন। এক পর্যায়ে ইমি ও তার সঙ্গে থাকা আরেকজনকে রিকশাসহ শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ মোট তিনজনকে আটক করে।
পরদিন ৮ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী আইন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে:
Anti Terrorism Act 2009
“আমরা কী সন্ত্রাসী কাজ করছিলাম?”
কারামুক্তির পর ইমি বলেন, “৭ মার্চ আমাদের পেটানো হলো, আমাদের ওপর হামলা হলো। এরপর আমাদের পুলিশে দেওয়া হলো।
আমরা সেদিন কী সন্ত্রাসের কাজটা করছিলাম?”
তার অভিযোগ, শুরুতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখাতে চায়নি। তবে “বৈষম্যবিরোধী” কর্মী, ছাত্রশিবির ও বিভিন্ন সংগঠনের চাপের মুখে পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য হয়।
ইমির ভাষ্য অনুযায়ী, “থানায় মব তৈরি হওয়ায় পুলিশ শেষ পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়।”
‘মব কালচার’ নিয়ে উদ্বেগ
মুক্তির পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন ইমি। তিনি বলেন, সরকারের চেয়ে বিরোধী শক্তি যদি বেশি ক্ষমতার চর্চা করতে থাকে,
তাহলে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ ধরনের “মব কালচার” ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিভাজন কমানোর আহ্বান জানিয়ে ইমি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, যেমন বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে সম্মান করা উচিত, তেমনি জিয়াউর রহমান–এর স্বাধীনতার ঘোষণাকেও স্বীকৃতি দিতে হবে।
কারাবাসে ‘অনেক কিছু হারানোর’ দাবি
দুই মাসের কারাবাস নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বড় ক্ষতি ডেকে এনেছে বলেও দাবি করেন ইমি।
তিনি জানান, মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। পারিবারিক জীবনেও বড় ধাক্কা এসেছে।
আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমি যেভাবে পরিবারকে রেখে গিয়েছিলাম, সেভাবে আর ফিরে যেতে পারব না। আমার অনেক কিছু হারিয়ে গেছে।”
এছাড়া তার মেজো ভাইকে আর কখনো দেখতে পাবেন না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ছোট ভাইয়ের বর্তমান অবস্থাও জানেন না বলে জানান।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। একপক্ষ বলছে, ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে
ধারণ করার অংশ; অন্যপক্ষের দাবি, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের কর্মসূচি উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর ইমির বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে “মবের চাপ”,
“রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা” এবং “মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা” নিয়ে তার মন্তব্য এখন আলোচনায় রয়েছে।
