রাজধানীর অদূরে কওমি মাদ্রাসায় টিটিপি জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা। অবৈধ আফগান নাগরিক ও টিটিপি প্রধানের গোপন বৈঠকের চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে নিরাপত্তা সংস্থা।
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে এক নতুন ও ভয়াবহ উদ্বেগের তথ্য সামনে এসেছে। রাজধানীর উপকণ্ঠের একটি কওমি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত রয়েছে। দেশের একাধিক নিরাপত্তা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে যে, মাদ্রাসার ধর্মীয় আবিলতাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রচার এবং পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে তরুণ শিক্ষার্থীদের সংযোগ স্থাপনের কাজ চলছে। এই ষড়যন্ত্রের মূল কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে এক রহস্যময় আফগান নাগরিকের নাম।
অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নিয়ামাতুল্লাহ ও বেনাপোল রুট
তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুসারে, নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গাল নামে এক আফগান নাগরিক গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অবৈধভাবে ভারত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
১৯৯১ সালে আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তির পাসপোর্টের মেয়াদ ২০২২ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বৈধ কোনো নথি না থাকা সত্ত্বেও তিনি যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকে রাজধানীর অদূরের একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে তিনি প্রায় এক মাস ওই মাদ্রাসায় অবস্থান করেন।
পরবর্তীতে কৌশলে দুই মাসের ট্রাভেল পাস জোগাড় করে দেশ ত্যাগ করার পর তার এই ‘মিশন’ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
টিটিপি প্রধানের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও ডিজিটাল যোগসূত্র
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে,
নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গাল বাংলাদেশে অবস্থানকালে টিটিপির বাংলাদেশ শাখার প্রধান ইমরান হায়দারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করতেন।
- সাক্ষাৎ ও পরিচয়: ওই মাদ্রাসায় অবস্থানকালে তিনি টিটিপি প্রধান ইমরান হায়দারের সঙ্গে মাদ্রাসার কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিচয় করিয়ে দেন।
- ডিজিটাল প্রমাণ: পুলিশের জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটের কর্মকর্তাদের হাতে আসা তথ্যানুসারে, ২১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে টিটিপি নেতাদের সাথে ভয়েস কল ও এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
‘উচ্চশিক্ষা’র আড়ালে পাকিস্তান যাত্রা: এক শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়া
তদন্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্যটি পাওয়া গেছে তা হলো, মাদ্রাসা পরিচালকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত ২১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী পাকিস্তান যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
১. পটভূমি: ওই শিক্ষার্থী দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খাসিয়া পাহাড় সংলগ্ন একটি সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দা।
২. ব্রেনওয়াশ: তদন্তকারীদের ধারণা, আফগান নাগরিক নিয়ামাতুল্লাহর সংস্পর্শে আসার পর তার মধ্যে উগ্রবাদী মতাদর্শের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
৩. নিখোঁজ সংবাদ: বর্তমানে ওই শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবারকে ‘উচ্চশিক্ষার’ কথা বলে তিনি পাকিস্তানে টিটিপি’র ডেরায় যোগ দিতে যাচ্ছেন বলে গোয়েন্দাদের আশঙ্কা।
মাদ্রাসা পরিচালকের সহকারী থেকে টিটিপি’র সদস্য?
পরিবারের কাছে ‘শান্ত ও মেধাবী’ হিসেবে পরিচিত ওই শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় ভালো আচরণের কারণে পরিচালকের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এই সরলতাকে কাজে লাগিয়েই তাকে উগ্রবাদের দীক্ষা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের মতে, টিটিপি মেধাবী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে কারণ তারা সহজেই আধুনিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ কৌশল বুঝতে সক্ষম।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও নজরদারি
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এখন এক ধরণের আন্তঃসীমান্ত সমন্বয় বা ‘ক্রস-বর্ডার কোঅর্ডিনেশন’ কাজ করছে।
তারা বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
- সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ: পাসপোর্টহীন এক আফগান নাগরিকের সীমান্ত পেরিয়ে রাজধানী পর্যন্ত আসা প্রমাণ করে যে, সীমান্ত নজরদারিতে এখনও বড় ধরণের ছিদ্র রয়েছে।
- অনলাইন মনিটরিং: উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেশি সক্রিয়, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
এখনই সময় কঠোর হওয়ার
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা ও তার আশেপাশে গোয়েন্দা নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নজরদারিই যথেষ্ট নয়।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন কোনোভাবেই বহিরাগত বা রহস্যময় বিদেশি নাগরিকরা বিনা অনুমতিতে আশ্রয় নিতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।
রাজধানীর খুব কাছে এমন একটি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিপদ ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে।
এখন থেকে সতর্ক না হলে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদের মরণফাঁদে পা দেওয়া আটকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
