৫ আগস্টের পর মব আক্রমণের শিকার মেহের আফরোজ শাওনের পরিবার। নিরাপত্তার অভাবে স্কুল ছেড়েছেন নিনিত হুমায়ূন। শাওনের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে দেশজুড়ে তোলপাড়।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কনিষ্ঠ পুত্র নিনিত হুমায়ূন। ১৫ বছরের এই কিশোরের এখন স্কুলে সহপাঠীদের সাথে ক্লাস করার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবতা আজ তার জন্য অত্যন্ত নিষ্ঠুর। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর উদ্ভূত ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনি প্রবণতার হাত থেকে রেহাই পায়নি এই কিশোরও। নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পেরে তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন অভিনেত্রী ও পরিচালক মেহের আফরোজ শাওন। বৃহস্পতিবার (৭ মে) শাওনের একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন ও বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
বনানীর স্কুল বন্ধ ও লেভেল পরীক্ষার টেবিলে
নিনিত হুমায়ূন বনানীর নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ‘CGSD’-তে পড়ত। অষ্টম শ্রেণি শেষ করে তার নবম শ্রেণিতে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু গত এক বছর তার স্কুলের আঙিনায় পা রাখা হয়নি। মেহের আফরোজ শাওন জানিয়েছেন, আজ ৮ মে থেকে নিনিতের ‘ও লেভেল’ পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। স্কুলে যেতে না পারার কারণে গত এক বছর প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়াশোনা করে তাকে সরাসরি এই বড় পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে। কেবল নিরাপত্তার শঙ্কায় একটি মেধাবী শিশুর স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন এভাবে ব্যাহত হওয়া আধুনিক সমাজের জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
তিনবার গাড়িতে হামলা ও পুলিশের ‘অসহায়ত্ব’
শাওনের বর্ণনায় উঠে এসেছে ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ফেসবুকে নিজের মত প্রকাশের জের ধরে তিনবার শাওনের গাড়ি লক্ষ্য করে মব আক্রমণ চালানো হয়। প্রতিবারই গাড়িতে নিনিত উপস্থিত ছিল। তৃতীয়বার আক্রমণের সময় চালককে মারধর করে গাড়ির মূল কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয় মববাজরা।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো প্রশাসনের ভূমিকা। শাওন জানান, থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান যে, তাদের ওপর নির্দেশ আছে মববাজদের বিরুদ্ধে কোনো রিপোর্ট না নেওয়ার। ফলে বাধ্য হয়ে জিডিতে লিখতে হয় যে, ‘অসাবধানতাবশত’ কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। এই ঘটনাটি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলার এক নগ্ন চিত্র উন্মোচিত করেছে।
জামালপুরের পৈতৃক ভিটা: লাইব্রেরি থেকে কঙ্কালে রূপান্তর
শাওনের ক্ষোভ কেবল ঢাকার ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি জানান, জামালপুরের এক নিভৃত গ্রামে তার বাবার বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
যেখানে এক সময় মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ বা জিল্লুর রহমানের মতো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদরা বেড়াতে যেতেন, সেই বাড়িটি এখন কেবল কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়িতে ছিল একটি পারিবারিক লাইব্রেরি, যেখানে দেশ-বিদেশের বহু দুর্লভ বই ও অর্জিত পুরস্কারগুলো পরম যত্নে রাখা ছিল। আগুনের লেলিহান শিখা সেই জ্ঞানের আধারকেও রেহাই দেয়নি।
শাওনের ভাষায়, “বিদেশের এসি রুমে বসে যারা এক্টিভিজম করেন, তারা এই যন্ত্রণার গভীরতা বুঝবেন না।”
সন্তানদের সুরক্ষা: ৩ মাসের যাযাবর জীবন
নিজের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে শাওন তাদের নানুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
আর নিজে গত ৩ মাস এক বাসা থেকে অন্য বাসায় যাযাবর জীবন কাটিয়েছেন।
৫ আগস্টের পর ঢাকার নিজ বাসাতেও বারবার আক্রমণের চেষ্টা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই অনিশ্চয়তা ও প্রাণভয় একজন শিল্পীর জীবনে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, শাওনের এই পোস্ট তারই প্রতিফলন।
মব সংস্কৃতি ও বাক-স্বাধীনতা
মেহের আফরোজ শাওনের এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এটি বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক অসহিষ্ণুতার এক চরম উদাহরণ।
- মত প্রকাশের মূল্য: কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশের জন্য কেন একটি শিশুকে আক্রমণের শিকার হতে হবে?
- প্রসাশনিক ব্যর্থতা: পুলিশের হাত-পা বেঁধে রাখা কি তবে মববাজদের আরও উৎসাহিত করছে?
- শিশুর অধিকার: একজন শিশুর শিক্ষার অধিকার হরণ করার দায় সমাজ ও রাষ্ট্র কীভাবে এড়াবে?
নিনিতের জন্য দোয়া
প্রতিবেদনের শেষে মেহের আফরোজ শাওন দেশবাসীর কাছে নিনিত হুমায়ূনের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
তিনি চান তার ছেলে যেন একজন ভালো মানুষ হতে পারে।
শৈশবের এই ভয়াবহ ট্রমা কাটিয়ে নিনিত যেন তার বাবার মতোই দৃঢ় ও মেধাবী হয়ে উঠতে পারে, সেই প্রত্যাশাই আজ ভক্ত-অনুরাগীদের।
মব কালচার বা বিশৃঙ্খল জনতা যখন আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তখন শাওনের মতো প্রতিটি নাগরিকেরই জীবন এমন বিপন্ন হয়ে পড়ে।
নিনিতের ও লেভেল পরীক্ষা কেবল একটি একাডেমিক পরীক্ষা নয়, এটি প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক পরীক্ষাও বটে।
